সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটের মাধ্যমে ডিজিটাল অপরাধের তদন্ত, সাইবার ফরেনসিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ পুলিশ স্টাফ কলেজের (পিএসসি) বোর্ডরুমে কলেজের পরিচালনা বোর্ডের ২১তম সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে শিক্ষাগত ও পেশাগত দক্ষতা থাকা অনেক সদস্য রয়েছেন। প্রস্তাবিত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটে তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগানো হবে। এর ফলে সাইবার অপরাধের ধরন শনাক্ত করা, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নিজেদের সাইবার ইউনিটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অপরাধের তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ করছে। এসব কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে অ্যাডহক ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সাইবার অপরাধের বিস্তার ও জটিলতা বিবেচনায় একটি স্থায়ী, পূর্ণাঙ্গ এবং সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে সরকার।
সভায় পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সদস্যদের মনোবল ও পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে মাস্টার ট্রেইনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও দক্ষ করে তুলতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
প্রয়োজনে বিদেশি প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তার মতে, প্রযুক্তি ও অপরাধের ধরন দ্রুত বদলে যাওয়ায় পুলিশ সদস্যদেরও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
পিএসসির পরিচালনা বোর্ডের সভায় আগের, অর্থাৎ ২০তম সভার কার্যবিবরণী উপস্থাপন করা হয়। প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে তা অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি আগের সভায় নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় পুলিশ স্টাফ কলেজের ভূমি ব্যবহারের জন্য এমআরটির প্রস্তাব, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কোর্সের বিদেশি অংশে প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং কলেজের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ‘গবেষণা ও উদ্ভাবন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া পুলিশ স্টাফ কলেজের বিধিসমূহের সরকারি অনুমোদন এবং বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণকে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়নের অগ্রাধিকার শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও সভায় উঠে আসে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুলিশ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ইন্টারপা (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পুলিশ একাডেমিজ)-এর সদস্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর কার্যক্রম নিয়েও সভায় আলোচনা করা হয়।
পুলিশ স্টাফ কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, মাস্টার্স ইন ফরেনসিক সায়েন্স এবং মাস্টার্স ইন ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম অ্যান্ড গভর্ন্যান্স কোর্স চালুর প্রস্তাবও ছিল আলোচনায়। পাশাপাশি কলেজের রজতজয়ন্তী উদযাপন এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজনের বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিচালনা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির, বিপিএটিসির রেক্টর সাঈদ মাহবুব খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাসানুল মতিন, আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শামীম সোহেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশ স্টাফ কলেজের ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন। সেখানে কলেজের অবকাঠামো ও বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কেও তিনি খোঁজ নেন।