সাত দফা দাবি আদায়ে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি পথে পাঁচটি জেলায় পথসভার মধ্য দিয়ে রংপুরে গিয়ে শেষ হবে। রংপুর জিলা স্কুলে অনুষ্ঠিত হবে লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে কর্মসূচির বিস্তারিত জানান জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে লংমার্চ শুরু হবে। সেখানে সকাল ৮টা পর্যন্ত উদ্বোধনী সভা চলবে। এরপর লংমার্চের বহর রংপুরের দিকে অগ্রসর হবে। পথে গাজীপুরের ভোগরাপাড়া, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ, সিরাজগঞ্জ চৌরাস্তা, বগুড়ার চারমাথা এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পৃথক পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে রংপুর জিলা স্কুলে সমাপনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের দাবিগুলো আগে ছয় দফা থাকলেও এখন তা সাত দফায় পরিণত হয়েছে। নতুন করে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়টি দাবির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব দাবির পাশাপাশি জনস্বার্থ, মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সংসদ ও রাজপথে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে বিরোধী দলগুলো।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দেশে একের পর এক গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটছে এবং গুম-খুনের মতো ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুলনার মিরাজ শেখের সন্ধান এখনো মেলেনি বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলের পাঁচজন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর দাবি, তেল ও গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও প্রত্যাশিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স বা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কমিটি গঠনের পর বিরোধী দল থেকে ১০টি প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেগুলো সরকার যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শিল্প খাতেও পড়ছে বলে দাবি করেন আযাদ। তাঁর বক্তব্য, গ্যাসের সংকটে বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পে অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসের পাশাপাশি দেশে সার সংকটও দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, ক্ষমতায় যাওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না—এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি।
অর্থনৈতিক সংকট ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর জোর দেন হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, দেশের বড় সমস্যাগুলো সমাধানে সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়েও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সোচ্চার ছিলেন বলে দাবি করেন আযাদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদে জনস্বার্থ ও জনগণের অধিকার, আইনশৃঙ্খলা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিরোধী দল ভূমিকা রাখছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের লংমার্চকে কেন্দ্র করে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জোটটি। সাত দফা দাবিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে পথসভাগুলোতে স্থানীয় পর্যায়েও দাবিগুলো তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।