প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণা আসার পরদিনই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেল ভারতের আদানি পাওয়ারের। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির উৎপাদন নেমে আসে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে। একই সময়ে দেশে লোডশেডিংও বেড়ে যায়।
ঘটনার সময়গত মিল নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিলের সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর আসে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে তার অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি যাচ্ছেন না।
ঢাকার বক্তব্য, ব্রিকসের আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও জানানো হয়েছে।
আদানির ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির ঘাটতিতে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল না। ১১ সেপ্টেম্বর দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্যও এসেছে।
সামগ্রিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় বিদ্যমান ঘাটতির ওপর আরও চাপ পড়ে।
আদানি পাওয়ার এর আগে জানিয়েছিল, ভারতের রেলপথে চাপ, লোডিং বিধিনিষেধ ও কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমেছে। এ কারণে অফ-পিক সময়ে উৎপাদন কমিয়ে চাহিদার সময় সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
এরপর একটি ইউনিটে বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়। পিডিবির একজন সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিড ইউনিটে সমস্যা ও অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে সেটিকে ঠান্ডা করতে হয়। পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
অর্থাৎ আদানির ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ কমার কারণ রাজনৈতিক নয়; প্রথমে কয়লা সরবরাহের সমস্যা, পরে কারিগরি ত্রুটি।
গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ কিনছে।
চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম, জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যাহত হলে আদানির দায় কী—এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বর্তমান সংকট সেই প্রশ্নগুলোই আবার সামনে এনেছে। একটি বড় সরবরাহকারী কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হলেই যদি জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশের বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় কৌতূহল। প্রধানমন্ত্রী ভারত যাচ্ছেন না—এই ঘোষণা এলো ১০ সেপ্টেম্বর। পরদিনই আদানির একটি ইউনিট বন্ধ।
ঘটনা দুটি পরপর ঘটেছে। কিন্তু এর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো নেই। ফলে রাজনৈতিক সন্দেহ থাকলেও সেটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ নেই।
তবে চুক্তি অনুযায়ী আদানি পাওয়ারের সরবরাহের দায় কী, কয়লা সংকট কতটা দীর্ঘস্থায়ী ছিল এবং কারিগরি ত্রুটি মেরামতে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা বর্তমানে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার চাপেও রয়েছে। এ অবস্থায় বড় কোনো আমদানি উৎসে সমস্যা হলে তার প্রভাব দ্রুত জাতীয় গ্রিডে পড়ে।
তাই আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, চুক্তির শর্ত এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার প্রশ্নও জড়িত।
সবচেয়ে জরুরি হলো—আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমার প্রকৃত কারণ কী, তা পরিষ্কার করা।
যদি এটি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক করাই হবে মূল বিষয়। আর যদি চুক্তিগত কোনো ব্যর্থতা থাকে, তাহলে বাংলাদেশের অধিকার ও প্রতিকারের বিষয়টি সামনে আসবে।
আর যদি এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক চাপের যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি আর শুধু বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী দিল্লি গেলেন না, আর ঠিক পরদিনই আদানির বিদ্যুৎ কমে গেল—ঘটনা দুটি পাশাপাশি ঘটেছে। এখন আসল উত্তর খুঁজতে হবে রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, চুক্তি, উৎপাদনের তথ্য, কয়লা সরবরাহের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জবাবে।