তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গঠিত এই বোর্ড শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে কাজ করবে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিষয়টি জানান। এর আগে শ্রমিকদের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি নিয়ে সরকার, পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রী। বৈঠকে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পরিস্থিতি এবং চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি বিবেচনায় নিয়ে রোববারের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছয় সদস্যের বোর্ড গঠনের ঘোষণা আসে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এ বিষয়ে একমত হয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরাও বোর্ডে তাদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দিয়েছেন।
পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে একাধিক দাবি। এর মধ্যে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধ এবং বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের দাবি উল্লেখযোগ্য। শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এসব দাবিতে শনিবার রাজধানীর মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন কারখানা ও মার্কেটে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামেন। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনকে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বোর্ড গঠনের পরই শ্রমিকদের দাবি পূরণ হচ্ছে, এমনটি নয়। ন্যূনতম মজুরির পরিমাণ কত হবে, কোন সময় থেকে তা কার্যকর হবে এবং নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মালিকপক্ষের সক্ষমতা এবং শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করাই এখন নতুন বোর্ডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বেতনসংক্রান্ত অসন্তোষের কার্যকর সমাধান হবে। একই সঙ্গে চাকরির নিরাপত্তা, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার ও মালিকপক্ষ বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেবে।