রোববার (১ নভেম্বর) বেলা ২টার দিকে দিশাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন নৌ-পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, দিশা নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ, তার বন্ধু দীপ এবং দিশা উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর তারা কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। এই তথ্যগুলো সামনে রেখেই দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও দিশা। তারা মোটরসাইকেলে করে সেখানে যান। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
রেস্টুরেন্টের অন্য একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও দিশা লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে মোটরসাইকেলে করে তারা সেখান থেকে চলে যান।
তবে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাদের গন্তব্য কোথায় ছিল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই সময়ের গতিবিধি শনাক্ত করতে বিভিন্ন তথ্য ও আলামত যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট ছাড়ার পর তাহসিফের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে চাইছে তদন্ত সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও জুনিয়র বন্ধু দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
জিজ্ঞাসাবাদে তাহসিফের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং সেসব স্থানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তথ্য দেন দীপ। তবে তার দেওয়া বক্তব্যের কয়েকটি বিষয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পরে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, তাহসিফের মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কারা ছিলেন, কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। এ কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
নৌ-পুলিশ সূত্র জানায়, দীপের আগের বক্তব্য, তাহসিফের পরিবারের করা মামলার অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ এবং তদন্তে পাওয়া আলামত সমন্বয় করে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো, তাহসিফের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল এবং এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, তা শনাক্ত করা।
দিশাকে গ্রেপ্তারের পর সাত দিনের রিমান্ড আবেদনকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে দীপের বক্তব্য ও অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন তদন্ত কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ২৭ অক্টোবর রাতে রেস্টুরেন্টে যাওয়া থেকে শুরু করে সেখান থেকে বের হওয়ার পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইবে পুলিশ।
তবে দিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। রিমান্ড আবেদন করা হলেও আদালতের সিদ্ধান্ত এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী তদন্তের অগ্রগতি নির্ধারিত হবে। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।