রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ ছয় থেকে সাতজন মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণই হবে বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী দুই দিন আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নির্বাচন ও তাঁদের নাম চূড়ান্ত করতে বিলম্ব হওয়ায় পরবর্তী কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চলমান সংকট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ আশফাকুর রহমান। তাঁকে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং স্বাধীন সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, পোশাকশ্রমিকদের মূল দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে এসে সড়ক ছেড়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দাবি আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরও কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা এবং শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে দেখছে না সরকার। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত রাজনৈতিক তৎপরতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন শ্রমমন্ত্রী।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক শ্রমিক পরিচয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, কয়েকটি রাজনৈতিক দল শ্রমিকদের দাবিদাওয়াকে কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতের উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িত। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বাস্তবসম্মত সমাধান নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। নতুন মজুরি বোর্ড কত দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারে, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে কতটা সমঝোতা তৈরি হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর সন্ধ্যার বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত আসে—এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে চলমান সংকটের পরবর্তী গতিপথ।
শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে এবং তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে শিল্পমালিকদের জন্য উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হলেই পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।