ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা-৮ আসন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। একই সঙ্গে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিরুদ্ধে হাদিকে যথাযথ সম্মান না দেওয়া এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে খাটো করার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব দাবি তুলে ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের হাদিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়ানোর আহ্বান জানান রাশেদ।
রাশেদ খাঁনের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওসমান হাদি। এ সময় এনসিপির পক্ষ থেকে ওই আসনে রিকশাচালক সুজনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ঘটনা সামনে আসে। অন্যদিকে, জামায়াতের আমিরের ব্যক্তিগত সহকারী ও বুয়েট শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি জুবায়ের হাদিকে ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। ওই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েম নির্বাচন করবেন বলেও জানানো হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।
রাশেদ বলেন, হাদি তখন জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে মাত্র ৫০০ ভোট পেলেও তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকেই নির্বাচন করবেন। এ বিষয়ে হাদির ভাই ওমর হাদিও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। রাশেদের অভিযোগ, এনসিপি প্রথমে সুজনকে প্রার্থী হিসেবে সামনে এনে হাদিকে অপমান করেছে। পরে হাদির হত্যাকাণ্ডের পর সুজনকে চূড়ান্ত প্রার্থী না রাখার ঘটনাকে তিনি ওই সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে হাদিকে নির্বাচন না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন রাশেদ। তাঁর মতে, জীবদ্দশায় হাদি এনসিপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জুলাই আন্দোলনের ঐক্য বিনষ্ট এবং আন্দোলনকে কুক্ষিগত করার অভিযোগ তুলেছিলেন। পাশাপাশি জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন। রাশেদের অভিযোগ, মৃত্যুর পর হাদিকে দুই দলের আদর্শিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও জীবদ্দশায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বক্তব্য এই পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে রাশেদের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হাদিকে ঘিরে বিএনপিকে সতর্কবার্তা
পোস্টে রাশেদ খাঁন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর একটি মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চেয়ে ওসমান হাদির লড়াই বেশি শক্তিশালী—এমন তুলনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে হাদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
রাশেদের দাবি, হাদি জিয়াউর রহমানের আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতিকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করতেন এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংগ্রামকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরতেন। এ কারণে হাদিকে বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের এ ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানান।
কবর নিয়ে বিতর্ক না করার আহ্বান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ওসমান হাদিকে দাফন করা নিয়েও পোস্টে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন রাশেদ। তাঁর মতে, হাদির কবর নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা উচিত নয়। তিনি দাবি করেন, জীবদ্দশায় যমুনা ঘেরাও কর্মসূচি থেকে হাদি বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে যেন বাবার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
রাশেদ বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের বিপ্লবী চেতনা হাদি ধারণ করতেন। তবে জাতীয় কবির সঙ্গে হাদির তুলনা টেনে বিতর্কিত বক্তব্য না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, নজরুলের সমাধির পাশে হাদির কবর থাকা নিয়ে অযথা বিতর্কের প্রয়োজন নেই।
নুরুল হক নুরের বক্তব্য নিয়েও মন্তব্য
পোস্টে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর ও ওসমান হাদির সম্পর্কের প্রসঙ্গও তোলেন রাশেদ। তাঁর ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নুরুল হক নুর আক্রান্ত হওয়ার পর হাদি বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। অন্যদিকে, হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নুরুল হক নুরও তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
রাশেদের দাবি, নুরুল হক নুরের বক্তব্যের একটি অংশ কেটে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে নুরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে রাশেদ আরও বলেন, ওসমান হাদির বড় ভাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় তিনিও নুরের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
সবশেষে রাশেদ খাঁন বলেন, ওসমান হাদিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। তাঁর মতে, হাদিকে বিতর্কের কেন্দ্রে ঠেলে না দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।