• বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে রূপপুরের বিদ্যুৎ

newsline24 / ১৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে রূপপুরের বিদ্যুৎ
নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে রূপপুরের বিদ্যুৎ

মাসের পর মাসের বিলম্ব কাটিয়ে অবশেষে উৎপাদনে যাওয়ার পথে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। সব পরীক্ষা ও কারিগরি কাজ নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ করা সম্ভব হলে আগামী নভেম্বরেই কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে যুক্ত হবে নতুন এক অধ্যায়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতে নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পটি চালু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে। কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হওয়ার পর দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের সংযোজন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে উৎপাদন শুরুর আগে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ধাপ পার হতে হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি)-সংক্রান্ত একটি পরীক্ষার ত্রুটি সমাধানের কাজ চলছে। এই পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে রিঅ্যাক্টর চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে এরই মধ্যে জ্বালানি লোডিংসহ প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বি-টু ধাপকে অনেকে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ হিসেবে অভিহিত করেন। এই পর্যায়ে জ্বালানি লোডিংয়ের পর চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

চুল্লিতে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলে যে তাপ তৈরি হবে, তা ব্যবহার করে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরাবে। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।

তবে এই পর্যায়ে যাওয়ার আগে পিওআরভি পরীক্ষায় সফলতা পাওয়া জরুরি। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বি-টু ধাপ শেষ করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং এরপর টারবাইনের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ ক্ষমতায় স্টিম তৈরির পর্যায়ে যেতে প্রায় ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। সব মিলিয়ে সময় প্রয়োজন হতে পারে প্রায় নয় সপ্তাহ বা দুই মাস।

এই সময়সূচি ঠিকভাবে অনুসরণ করা গেলে নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোনো পরীক্ষায় নতুন কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট বলেন, ‘আইডিয়াল প্রোগ্রাম’ অনুসরণ করা গেলে নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় জটিলতা তৈরি হলে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও তিনি জানান।

প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে?

রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ২০১৬ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৪ টাকা ৬৫ পয়সা ধরা হয়েছিল। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে শুধু মূল উৎপাদন ব্যয় নয়, পরিচালন ব্যয় ও বিমা ব্যয়সহ অন্যান্য খরচও হিসাবের মধ্যে আসবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এ বিষয়ে পিডিবি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে। এসব তথ্যের বিষয়ে সমঝোতা ও হিসাব চূড়ান্ত হওয়ার পর বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোবে।

প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেনের মতে, সব ধরনের খরচ বিবেচনায় নেওয়ার পরও রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সম্ভাব্য হিসাব হিসেবেই দেখতে হবে।

স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই

রূপপুর চালু হওয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চুল্লিতে ব্যবহারের পর যে জ্বালানি অবশিষ্ট থাকে তাকে স্পেন্ট ফুয়েল বলা হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার-টু-সরকার চুক্তিতে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি রয়েছে। তবে এ জন্য বাংলাদেশকে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ব্যবহৃত জ্বালানি তাৎক্ষণিকভাবে চুল্লি থেকে সরিয়ে নিতে হবে এমন নয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় রিঅ্যাক্টর এলাকায় সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে এখনই তাৎক্ষণিক চাপ না থাকলেও ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

ভারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর শুধু ব্যবহৃত জ্বালানিই নয়, বিভিন্ন ধরনের তেজস্ক্রিয় ও অন্যান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ জায়গাতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, স্পেন্ট ফুয়েলের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর নিয়মিত যে ভারি বর্জ্য তৈরি হবে, তার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখন থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এসব বর্জ্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া দরকার।

রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, তাই প্রকল্পটির সাফল্য শুধু জাতীয় গ্রিডে নতুন বিদ্যুৎ যোগ করার ওপর নির্ভর করছে না। নিরাপদ পরিচালনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সব পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে সফল হলে নভেম্বরে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্প পরিচালক নিজেই যে সতর্কতার কথা বলেছেন, তাতে শেষ পর্যায়ের প্রতিটি কারিগরি পরীক্ষা সময়সূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেই পরীক্ষাগুলো নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার অপেক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category