বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় গ্রেফতার জেরিকা তাসনীম দিশাকে (১৯) আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। মামলার তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দিশার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দিশাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক যোগাযোগের তথ্য
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে নিহত তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন দিশা। এর আগেও তারা একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে একসঙ্গে গেছেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া মামলার অপর আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের (২৩) সঙ্গেও একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে দিশাকে একসঙ্গে দেখা গেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের তথ্যও তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে তুলে ধরা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাহসিফের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের আগে দিশার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথাও আদালতকে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি হত্যায় ব্যবহৃত বা সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধারের জন্য দিশাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
এ ছাড়া মামলার অপর আসামি দীপ জিজ্ঞাসাবাদে যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলোর সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার মতে, দুই আসামির বক্তব্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ
মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় তার মা ফোন করে খোঁজ নেন। তখন কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরে আসার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে এরপর আর বাসায় ফেরা হয়নি তাহসিফের। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তার মোবাইল ফোন থেকে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। ওই বার্তার পরও তাহসিফের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে।
বাবার করা মামলায় গ্রেফতার দীপ
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ৩০ অক্টোবর রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। মামলাটির তদন্তে নেমে পুলিশ পরবর্তী সময়ে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেফতার করে।
তদন্তের একপর্যায়ে দিশার নাম সামনে আসে। পরে তাকে গ্রেফতার করে মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেওয়া হয়। প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড শেষে এবার দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড পেলেন তিনি।
তবে তাহসিফ হত্যার প্রকৃত কারণ কী, কোথায় এবং কীভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের বিষয়। দিশা ও দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই এবং উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া মানেই কোনো আসামির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত মামলার দায় নির্ধারিত হবে।