রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থীর জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৫০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল ড্রেসের জন্য ৬০০ টাকা, স্কুলব্যাগের জন্য ৬০০ টাকা, জুতার জন্য ৭০০ টাকা এবং মোজার জন্য ৫০ টাকা বরাদ্দের হিসাব করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত এই অর্থ সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে প্রকৃত ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে।
শিক্ষার্থীদের এসব উপকরণ দেওয়ার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে পাঁচ বছর মেয়াদি পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বা পিইডিপি-৫-এর আওতায়। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে।
প্রকল্পের ব্যয় কমানোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে পিইডিপি-৫-এর সম্ভাব্য ব্যয় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা, পুনর্বিন্যাস এবং কিছু কার্যক্রম অন্য প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) গত জুনে শেষ হয়েছে। এরপর জুলাই থেকে পিইডিপি-৫ চালুর পরিকল্পনা ছিল। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছর প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষক ব্যবস্থাপনায় আসছে নতুন নীতিমালা
প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের পেশাগত ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, বদলি ও মূল্যায়ন—এই পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নতুন শিক্ষক নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
আগামী ১৭ নভেম্বর নতুন শিক্ষক নীতিমালার তৃতীয় খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী মনিটরিং কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক নীতিমালার তৃতীয় খসড়াও জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। বিদ্যালয়ের পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তদারকির দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। এসব কর্মকর্তার দায়িত্ব ও কাজের মান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পৃথক নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব চিত্র ও সমস্যাগুলো জানতে গত দুই মাসে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তা এবং ১ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষকসংকট, পাঠদানের মান, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের পরামর্শের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
স্মার্ট ক্লাসরুম ও শিক্ষকদের জন্য ট্যাব
প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতেও কয়েকটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, বিদ্যালয়ে ওয়াইফাই সংযোগ, শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরি এবং ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কার্যক্রম।
বিশেষ করে শিক্ষকদের হাতে ট্যাব পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগে ২০২৭ সালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে একবারে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে ট্যাব দেওয়ার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা এবং শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। স্মার্ট ক্লাসরুম ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পাঠদান আরও আকর্ষণীয় করা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক বদলি বন্ধ, চালুর প্রস্তুতি অনলাইনে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতীয় পর্যায়ের বদলি কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম চালু আছে।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষক বদলি আবার চালুর আগে আরও যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষক নীতিমালাতেও বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
বর্তমানে শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে কর্মস্থল, শূন্য পদ, ব্যক্তিগত প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং আবেদনকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই, শূন্য পদের হিসাব এবং বদলির সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পিইডিপি-৫ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের কার্যকারিতার ওপর। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য পোশাক ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষক বদলিতে অনলাইন পদ্ধতি চালু হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।