অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য চিহ্নিত করা এবং কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সঠিক তথ্য ছাড়া কোনোভাবেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণে সরকার তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে কাজ করছে এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে ‘জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের অর্থনীতিকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক করতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত না হলে রাজনৈতিক গণতন্ত্রও কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত থাকলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর একটি হলো তথ্য বা ডেটা। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি কিংবা সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই সরকারি তথ্য হতে হবে স্বচ্ছ, নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও পরিমাপযোগ্য। এসব তথ্যের ওপর জনগণ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের আস্থা থাকা জরুরি।
সরকারি পরিসংখ্যানে কোনো ধরনের কারসাজি বা তথ্য বিকৃতির বিষয়ে সতর্ক করে আমির খসরু বলেন, তথ্যের যথার্থতা নষ্ট করা হলে সরকার নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করে। কারণ, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনো দেশের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। বরং এতে নীতিনির্ধারণে ভুলের ঝুঁকি বাড়ে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তব চিত্র আড়ালে থেকে যায়।
প্রশাসনিক সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতা এবং সরকারের কর্মসূচির সঙ্গে প্রশাসনের কাজের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্বাচিত সরকারের নীতি, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করাকে তিনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যানের গুরুত্ব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশের কোন খাতে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, কোথায় বৈষম্য বেশি এবং কোন জনগোষ্ঠী উন্নয়নের সুবিধা থেকে পিছিয়ে রয়েছে—এসব বিষয় নির্ভুল তথ্যের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ থাকলে সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার পাশাপাশি নতুন গবেষণা ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, কোনো সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে হলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অতীতের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সেগুলোর সংশোধন করাই সরকারের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে ডেটাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তথ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, সরকার যত বেশি তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করবে, তত বেশি মানুষের মতামত ও প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে সরকারি কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি সহজে চিহ্নিত করা যাবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনায় সংশোধন আনা সম্ভব হবে।
এ লক্ষ্যেই গবেষক, শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহারের জন্য অনলাইনে একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার বা ওপেন ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। অর্থমন্ত্রীর মতে, তথ্য কেবল সরকারের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত থাকার বিষয় নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গবেষণার স্বার্থে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সবার ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হবে।
নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আধুনিক ও কার্যকর ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে নির্ভুল তথ্য ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। সরকারের পরিকল্পিত ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ওয়ালেট, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নাগরিকদের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের ডিজিটাল উদ্যোগ কার্যকর করতে নাগরিকদের তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য শক্তিশালী তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং তথ্যের মান নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও ডিজিটাল সেবা কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ সময় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিদ্যমান জনবল সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী এ সংকট নিরসনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন পরিসংখ্যান ব্যবস্থা ছাড়া তথ্যভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি তথ্যের নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে একটি তথ্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
জাতীয় পরিসংখ্যান দিবসের আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—সরকারি পরিসংখ্যানে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, জনগণের জন্য তথ্য উন্মুক্ত করা এবং নির্ভরযোগ্য ডেটার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা যাচাই এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।