পোশাক খাতের শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীসহ ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নির্দেশনার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের সুযোগ আপাতত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) দেশের সব ব্যাংকের কাছে এ-সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠায়। নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ই-মেইলের মাধ্যমে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা পাঠানো হয়েছে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কর ফাঁকি, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগের বিষয়টি সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন দেশের পোশাক ও শিল্প খাতের পরিচিত কয়েকজন উদ্যোক্তা এবং সাবেক সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
তালিকায় রয়েছেন সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। এ ছাড়া এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্রুপের মালিক ও সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নামও রয়েছে।
একই তালিকায় রয়েছেন ফেবিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল। ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম মোশাররফ হোসেনের নাম উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপাসহ আরও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় রয়েছেন।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং আয়কর আইনে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে ব্যাংক হিসাব জব্দের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোতে থাকা অর্থ উত্তোলন, অন্য হিসাবে স্থানান্তর কিংবা অন্য কোনো উপায়ে লেনদেন করা যাবে না।
ব্যাংক হিসাব জব্দের তাৎপর্য
ব্যাংক হিসাব জব্দের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এর ফলে ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ ব্যবহার, উত্তোলন কিংবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। সাধারণত আর্থিক অনিয়ম, কর ফাঁকি, অর্থ পাচার বা সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এটি মূলত তদন্ত ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
এনবিআরের এই পদক্ষেপের ফলে দেশের তৈরি পোশাক খাতের কয়েকজন প্রভাবশালী উদ্যোক্তা এবং সাবেক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের কী ধরনের যোগসূত্র রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ কিংবা প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের অগ্রগতি এবং এনবিআরের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপরই বিষয়টির পরবর্তী চিত্র নির্ভর করছে।