মাদক কারবারের সঙ্গে সরকারদলীয় কিংবা বিরোধী দলের কোনো নেতা জড়িত থাকলেও তাকে আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকের গডফাদার যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের হাত কাঁপলে চলবে না।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জেলা আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘মাদক কারবারের সঙ্গে বা মাদকের গডফাদার হিসেবে সরকারদলীয় কিংবা বিরোধী কোনো নেতার সম্পৃক্ততা থাকলে, তাকে ধরতেও যেন আপনাদের হাত না কাঁপে।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে ছাড় দেওয়া যাবে না। এমনকি তিনি যে রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সেই বিএনপির কোনো প্রভাবশালী নেতাও যদি কোনো অপরাধীকে পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করেন, তাহলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এখানে কোনো পক্ষপাত নেই’—বলেন তিনি।
অভিযোগ পাওয়ার পর সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। এরপর আদালতের প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। কোনো আসামি আদালত থেকে জামিন পেলে সেটি তার আইনগত অধিকার। তবে জামিনের পর কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কিংবা পুলিশ তাকে ধরতে ভয় পাচ্ছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।
মাদকবিরোধী অবস্থান বোঝাতে গিয়ে নিজের এলাকার একটি ঘটনার উদাহরণ দেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, গত সপ্তাহে তার একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আসে।
পুলিশ বিষয়টি তাকে জানালে তিনি ওই নেতাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন বলে সভায় জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর মাদক সেবনের পরীক্ষায় ওই নেতার ফল পজিটিভ আসে। পরে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে এক বছরের সাজা দেওয়া হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, ওই ব্যক্তি তার নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নিবেদিতভাবে কাজ করা নেতাদের একজন ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বা নির্বাচনী ভূমিকা অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় পাওয়ার কারণ হতে পারে না।
তার মতে, একজন রাজনৈতিক কর্মীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হলো নৈতিক স্বচ্ছতা। জনগণের কাছে গিয়ে কেউ যদি মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন, অথচ নিজেই মাদকমুক্ত না থাকেন, তাহলে সেই অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাগেরহাটে মাদক কারবারিদের কর্মকাণ্ডের দায় কোনো রাজনৈতিক দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের ওপর চাপানো উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাগেরহাট জেলায় যদি ১০ জন ব্যক্তি মাদক বিক্রি করেন এবং তাদের সবাইকে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ওই ১০ জনের কর্মকাণ্ডের কারণে হাজারো মানুষের মধ্যে পুরো বিএনপির প্রতি বিরূপ ধারণা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক দল কিংবা সরকার হিসেবে তারা এমন ঝুঁকি নিতে চান না।
আইনমন্ত্রী বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি মাদক কারবারিদের পেছনে থেকে সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাকেও সতর্ক করা হচ্ছে।
জামিনের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার বলেও স্পষ্ট করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো আসামিকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত আদালত নেবে। তবে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করার জন্য জামিন নেওয়া, দেওয়ার চেষ্টা কিংবা জামিন ঠেকাতে বেআইনি তৎপরতা চালানো হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সভায় দেশের গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে, যেসব ঘটনাকে ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তার দাবি, ওই সময়ে চার হাজারের বেশি বিএনপি নেতাকর্মী গুম ও ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৬-১৭ বছরে প্রায় ৭০০ বিএনপি নেতাকর্মী গুম হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ‘মিথ্যা’ ও ‘গায়েবি’ মামলা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় বাগেরহাটের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনজীবী সমিতির নেতা, জেলা বিএনপির নেতারা, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে অপরাধ দমনে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আইন প্রয়োগ এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি।