শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ পলাতক ৩০ আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আত্মসমর্পণের বিষয়ে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন। এর ফলে পলাতক আসামিদের আদালতের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
এদিন মামলায় গ্রেপ্তার ১০ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, দীপু মনি ও শামসুল হক টুকু, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল এবং ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু। অসুস্থতার কারণে সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি।
মামলায় পলাতক ৩০ আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এবং তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ।
এ তালিকায় আরও রয়েছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং সাবেক যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক ও তৎকালীন কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নামও মামলার আসামির তালিকায় রয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান রয়েছেন।
এর আগে গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ শাপলা চত্বর মামলায় ৪১ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং কারাগারে থাকা আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলায় মোট দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর প্রথমটিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ৩২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে আসামিদের যোগসাজশে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে অভিযান চালানো হয়। এতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য ছিল হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করা—এমন অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
শাপলা চত্বরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬১ জন নিহতের একটি তালিকা পাওয়া গেছে বলে মামলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও রয়েছে।
পলাতক আসামিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শাপলা চত্বর হত্যা মামলায় পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, পলাতক ৩০ আসামিকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এ বিষয়ে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ করেন কি না, এরপর তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।