মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে জামালপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন (৫০)। সঙ্গে ছিল জমি বিক্রির অবশিষ্ট প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। কথা ছিল, সকালে গাজীপুরের জিরানীতে পৌঁছাবেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি সেখানে পৌঁছাননি। ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে।
এরপর পরিবারের কাছে আসে দুঃসংবাদ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশের মুখ থেকে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইসমাইলের মরদেহ।
শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে বনানী থানা-পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। সে সময় তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশের উদ্ধার করা মরদেহের মুখে স্কচটেপ লাগানো ছিল। তার পরনে ছিল লুঙ্গি এবং গায়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের একটি শার্ট।
পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে মরদেহ শনাক্ত করেন ইসমাইলের ছেলে মো. হাসান। তিনি জানান, ছোট বোন শারমিনের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার জন্যই তার বাবা গাজীপুরে যাচ্ছিলেন।
হাসানের ভাষ্য, ইসমাইলের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ছিল। এ ছাড়া তার কাছে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোনও ছিল। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের সময় টাকা ও মুঠোফোন—কোনোটিই পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইসমাইলের সর্বশেষ কথা হয় বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে। এরপর তিনি গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন।
হাসান জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে জামালপুর থেকে যাত্রা শুরু করেন তার বাবা। সকালে গাজীপুরের জিরানীতে পৌঁছানোর কথা ছিল। সেই অনুযায়ী তাকে আনতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু নির্ধারিত সময়েও ইসমাইল সেখানে না পৌঁছালে তার মুঠোফোনে কল করা শুরু করেন হাসান। একাধিকবার ফোন করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্যেই বনানী থানা-পুলিশ থেকে তাদের গ্রামের বাড়ির পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগ করা হয়। সেখান থেকেই পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, ঢাকায় একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ দেখে ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তার ছেলে।
ইসমাইলের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে সম্প্রতি ১১ শতাংশ জমি বিক্রি করেছিলেন তিনি। জমিটি বিক্রি হয়েছিল সাড়ে ১০ লাখ টাকায়।
জমি বিক্রির পুরো টাকা অবশ্য তার কাছে ছিল না। এর মধ্যে আগের দুই লাখ টাকার একটি ঋণ পরিশোধ করেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণেও জমি বিক্রির টাকার একটি অংশ ব্যয় করেন।
সব খরচ বাদ দেওয়ার পর তার কাছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা অবশিষ্ট ছিল। সেই টাকা নিয়েই মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন বলে জানান তার ছেলে।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশের কাছে তার মরদেহ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মরদেহের মুখে স্কচটেপ লাগানো থাকা এবং তার সঙ্গে থাকা টাকা ও মুঠোফোন না পাওয়ার বিষয়টি ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে। তবে ইসমাইল কীভাবে মারা গেলেন, তার সঙ্গে থাকা টাকা ও মুঠোফোনের কী হয়েছে কিংবা ঘটনাটির পেছনে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।