শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজের সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছে। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে দেশে বারবার বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হবে। যারা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পরিণতি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মতো হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, এই দিবসের কথা শুনতে শুনতেই তাঁর জীবনের ৫৫ বছর কেটে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনা থেকে রাজনীতিবিদদের যে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, অনেকেই তা গ্রহণ করেননি।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর দাবি, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকার দেশের ইসলামী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াত আমিরের ভাষ্য, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও অল্প সময়ের মধ্যে তৎকালীন সরকার জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে। দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও গণমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠান থাকার পরও সরকার নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জবাবদিহির আশঙ্কা থেকে রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, বাহিনীটিকে এমন ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর অভিযোগ, রক্ষীবাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ বিনা বিচারে নিহত হয়েছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বক্তব্যে উত্থাপিত এসব ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের পক্ষে তিনি কোনো বিস্তারিত সূত্র বা নথি উপস্থাপন করেননি।
মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সিরাজ শিকদার নিহত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোথায় সে?’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। একজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে হত্যার পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া বিচারব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞার প্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের পরিণতি হিসেবে বর্ণনা করেন জামায়াত আমির। তাঁর মতে, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা, অপমান এবং উপেক্ষা করার কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই মূলত বিদ্রোহের সূত্রপাত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার শুরুতে সাধারণ মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না।
এ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, ১৯৭৫ সালে তিনি সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনার পরদিন সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও শুক্রবার জুমার নামাজের জন্য তিন ঘণ্টা তা শিথিল করা হয়েছিল।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, জুমার নামাজ আদায় করতে বাইরে বেরিয়ে মসজিদ, বাড়িঘরের ছাদ ও রাস্তায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি দেখেছিলেন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল বলে তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে।
তাঁর দাবি, কারফিউর কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল সীমিত থাকায় জনমনের প্রকৃত প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। তবে জুমার নামাজের সময় মানুষের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে ওই সময়ের জনমতের একটি চিত্র বোঝা গিয়েছিল।
স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের অবদান নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে যাঁর যে অবদান রয়েছে, তাঁকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছোট করা কিংবা কোনো ব্যক্তির অবদান আড়াল করার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা যিনি দিয়েছেন, তাঁর ভূমিকা যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যাঁর নাম জড়িত, তাঁর অবদানও আলোচনায় রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর অবদানও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াত আমিরের মতে, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক মানসিকতার কারণে অনেক সময় অন্যদের অবদান যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নিজের বা নিজ দলের নেতৃত্বের বাইরে অন্য কারও ভূমিকা স্বীকার করতে অনীহা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক নয়। দেশের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে হলে দল-মতনির্বিশেষে সবার অবদান স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত একটি দিন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দেশে একের পর এক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর সিপাহি ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশের অংশগ্রহণে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। এ ঘটনায় তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথও তৈরি হয়।
দিনটি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করে। কারও কাছে এটি সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কারও কাছে জাতীয় সংহতির প্রতীক, আবার কারও কাছে এটি সামরিক ক্ষমতার পালাবদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে ৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং ঘটনাপ্রবাহের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতিতে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।