বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেটরো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে জেটরোর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে জাপানি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গাড়ি নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উৎপাদনশিল্পে নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগ পরিবেশ, দক্ষ জনবল এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। বর্তমানে প্রচলিত রপ্তানি খাতের পাশাপাশি নতুন পণ্য ও শিল্প খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারসংযোগ উন্নয়নের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উভয় পক্ষ একমত হয়। অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের কাঠামো আরও বিস্তৃত হলে ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর পথ সুগম হতে পারে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় দেশটির সহযোগিতা চান। জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা গেলে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত যোগ্যতা এবং কাজের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
জেটরোর প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভৌগোলিক অবস্থানকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বৈঠক শেষে জেটরোর প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী জেটরোর প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ ছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের আলোচনায় বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ, রপ্তানিতে নতুন পণ্যের সংযোজন এবং জাপানের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে আলোচনার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।