• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
আওয়ামী লীগকে আগলে রাখছে বিএনপি, নাহিদ ইসলামের অভিযোগ দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণে নতুন উদ্যোগ, পদ্মা ব্যারেজেও জোর নওগাঁ কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন আ. লীগ নেতা জাকির জাকির নায়েক প্রত্যর্পণে অনড় মালয়েশিয়া, ভারতের দাবি মানছে না কুয়ালালামপুর রাজপথের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পর্ক নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জমির সীমানা নির্ধারণে ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, এক লাখ নিতে গিয়ে গ্রেপ্তার সার্ভেয়ার হাদি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন জমায় ফের পেছাল সময় কুষ্টিয়ায় রেলওয়ের জমি বিক্রির অভিযোগ, দুই কাঠার দাম ৩ লাখ ডিসেম্বর ঘিরে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার ছক, গোয়েন্দা নজরদারিতে একাধিক ব্যক্তি সীতাকুণ্ডে ট্যাংকলরির চাপায় প্রাণ গেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর

ডিসেম্বর ঘিরে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার ছক, গোয়েন্দা নজরদারিতে একাধিক ব্যক্তি

newsline24 / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
ডিসেম্বর ঘিরে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার ছক, গোয়েন্দা নজরদারিতে একাধিক ব্যক্তি
ডিসেম্বর ঘিরে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার ছক, গোয়েন্দা নজরদারিতে একাধিক ব্যক্তি

তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে পরিকল্পিত উসকানি ও স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়ার দাবি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবিকে কাজে লাগিয়ে ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। এ উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো, কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার তথ্যও উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে পতিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী এবং একাধিক শ্রমিক সংগঠনের নেতার সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়সহ একটি প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে যাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে সামনে রেখে একটি গোষ্ঠী পোশাকশিল্পে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে চায়। এ জন্য শ্রমিকদের উসকানি দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও উত্তেজনাকর বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে অর্থায়নের তথ্যও গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। কারখানা ভাঙচুরের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং স্পর্শকাতর স্থাপনায় নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে। মেট্রোরেল, ব্যাংক, শিল্পকারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।

বিশেষ করে রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের উত্তেজিত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে গোয়েন্দা সংস্থাটি। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে যা বলছেন নেতারা

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন শ্রমিক নেতারা।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। এটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বিষয়। তবে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করে অন্য কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার খবরও সামনে এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় শ্রমঘন এলাকাগুলোতে তাদের কর্মীদের নানা ধরনের প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তাসলিমা আখতার। তার মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, মালিকপক্ষের উচিত দ্রুত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া। এ প্রক্রিয়ায় অযথা সময়ক্ষেপণ করা হলে সুযোগ নিতে পারে আন্দোলনবিরোধী বিভিন্ন পক্ষ। শ্রমিকদের দাবির দ্রুত ও কার্যকর সমাধান হলে অস্থিরতা কমিয়ে আনা সহজ হবে।

সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে শ্রমিকরা এক ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অনেকে কাজে যোগ দিতে চাইলেও বাধার মুখে পড়ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারখানার দিকে ঢিল ছোড়া হচ্ছে, শ্রমিকদের পথ আটকে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ এতে রাজি না হলে তার ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে।

নাজমা আক্তারের মতে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কারও বাধা দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু আন্দোলনের নামে কারখানা ভাঙচুর কিংবা উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত এর নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকদের ওপরই পড়বে। কারণ শিল্পের উৎপাদন ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকদের আয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

পোশাকশিল্পকে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার করার আশঙ্কা

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে তারা মনে করেন।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অনেক। বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও এ খাতের বড় অবদান রয়েছে। ফলে এ শিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মালিক বা শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।

ফজলে শামীম এহসানের ভাষ্য, শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ শ্রমিকরা নিজেদের কর্মস্থল ও জীবিকার গুরুত্ব বোঝেন। তাই কারখানা ভাঙচুরের মতো কর্মকাণ্ডের পেছনে বাইরের কোনো পক্ষের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যারা পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা সৃষ্টি করছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

শিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকার ওপর লাখো শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশীয়-আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক নির্ভরশীল। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও অধিকারসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হলে অসন্তোষ তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রকৃত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ সহিংসতা বা নাশকতা করছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। শ্রমিকদের অভিযোগের দ্রুত সমাধান, মজুরি নিয়ে কার্যকর আলোচনা এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

ডিসেম্বরকে ঘিরে অস্থিরতা তৈরির যে আশঙ্কা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা মোকাবিলায় এখন থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে শ্রমিকদের স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category