মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা।
ব্রিফিংয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টা কেবল চলতি সময় কিংবা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডিসেম্বরের পরও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে সরকার মনে করছে।
আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ তৈরি করতেই এসব অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে হাজার হাজার লোক নিয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। তিনি যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে সরকার মনে করে। তবে সরকার এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করবে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর মতে, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সক্রিয় হওয়ার সক্ষমতা সীমিত থাকলেও দলটির কাছে থাকা বিপুল অর্থ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা তৈরির পেছনে অর্থের জোগান ও পরিকল্পিত তৎপরতা থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের উল্লেখ করে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব ঘটনার সঙ্গে সীমান্তের ওপারের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
শ্রমিকদের আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি ও চলমান আন্দোলন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই শ্রমিকদের প্রতি আন্দোলন প্রত্যাহার করে আলোচনার মাধ্যমে দাবি-দাওয়া তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অতীতে ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০২৩ সালে নতুন করে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ২০২৩ সালের পর ২০২৮ সালে মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আসার কথা।
তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগেভাগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা করেই নির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে মজুরির বিষয়টি সরাসরি জড়িত।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বাড়লে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে মজুরি পুনর্বিবেচনার দাবি সামনে আসে। অন্যদিকে, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়।
এ কারণে নতুন মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য প্রত্যাশা এবং শিল্পের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মঙ্গলবারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সম্ভাব্য নাশকতা মোকাবিলা এবং পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিবেচনা—এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব পায়। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার অবস্থান জানিয়েছে সরকার, অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আগাম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।