ব্যাংকটির আইটি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়েবসাইটের দুটি স্থানে হামলার চিহ্ন পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে সেগুলো দূর করার পাশাপাশি সাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে রোববারের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি নিরাপদভাবে চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তবে এ বিষয়ে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ শূন্য থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত ১৯ অক্টোবর জনতা ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। পরদিন থেকে দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ব্যাংক খাতে টানা পাঁচ দিনের ছুটি শুরু হয়। এই ছুটির মধ্যেই বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকটির ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি (PHP)-এর দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
গত ২১ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এনিসা (ENISA) এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে যৌথ সতর্কতা দেয়। সতর্কবার্তায় বলা হয়, এসব ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা আক্রান্ত সার্ভারে দূর থেকে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, সার্ভার ও অ্যাপ্লিকেশনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাছে এ ধরনের দুর্বলতা উদ্বেগের বিষয়। কারণ, কোনো সার্ভারের সফটওয়্যারে নিরাপত্তার ফাঁক থাকলে তা কাজে লাগিয়ে অননুমোদিত ব্যক্তিরা সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এর মাধ্যমে ওয়েবসাইটের তথ্য পরিবর্তন, ক্ষতিকর কনটেন্ট যুক্ত করা কিংবা সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারের নিরাপত্তা প্যাচ বা হালনাগাদ সংস্করণ দ্রুত ইনস্টল করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ্লিকেশনগুলো সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সুপারিশও করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে গত বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
তবে ছুটি শেষে রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট আবার চালু করা সম্ভব হলেও জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। ব্যাংকটির ওয়েবসাইটে ম্যালওয়্যার সংক্রমণের আলামত পাওয়ায় নিরাপত্তা যাচাই ও ত্রুটি সংশোধনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। ফলে ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালুর আগে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
ওয়েবসাইট বন্ধ থাকা মানেই ব্যাংকের সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। ওয়েবসাইট মূলত গ্রাহকদের তথ্য, বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি, সেবা-সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং অন্যান্য অনলাইন তথ্য সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে ব্যাংকের শাখা ও অন্যান্য লেনদেনব্যবস্থার কার্যক্রম আলাদাভাবে পরিচালিত হতে পারে। জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটের সমস্যার কারণে ব্যাংকটির সব ধরনের লেনদেন ব্যাহত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য অবশ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো পুরোপুরি দূর করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ত্রুটি শনাক্ত করার পর দ্রুত সাইট চালু করার চেয়ে নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করে পুনরায় চালু করাই এ ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইটি বিভাগের কর্মকর্তারা রোববারের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি সচল করার আশা প্রকাশ করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট কবে নাগাদ পুরোপুরি সচল হবে, তা নির্ভর করছে নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার ওপর।