• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নানা আয়োজন, ঢাকাজুড়ে যানজট পুলিশ সেজে ১০২ ভরি স্বর্ণ লুট, ৮৮ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার ৪ ২৫২ টাকা বৃদ্ধির পর ফের বাড়তে পারে এলপিজির দাম রূপপুরের বিদ্যুতের ইউনিট ১০ টাকা, ব্যয় নিয়ে টানাপোড়েন নতুন পে স্কেলের চাপে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার  বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ: রিজভী চুল কাটার টাকা চাওয়ায় ক্ষোভ, সেলুন থেকে বাড়ির উঠান—ছুরিকাঘাতে নিহত নরসুন্দর কিশোরীর বিয়েতে আপত্তি, টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষে আহত ১০ ঢাকার মেট্রোরেলে বড় চুক্তি পেল ভারতের এলঅ্যান্ডটি জাপানি বিনিয়োগ টানতে পাঁচ খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ

রূপপুরের বিদ্যুতের ইউনিট ১০ টাকা, ব্যয় নিয়ে টানাপোড়েন

newsline24 / ৪ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
রূপপুরের বিদ্যুতের ইউনিট ১০ টাকা, ব্যয় নিয়ে টানাপোড়েন
রূপপুরের বিদ্যুতের ইউনিট ১০ টাকা, ব্যয় নিয়ে টানাপোড়েন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। প্রকল্পের বিনিয়োগ, ঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয়, বিমা এবং অন্যান্য খরচের হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। বিদ্যুৎ কেনার মূল্য চূড়ান্ত হওয়ার পরই জানা যাবে, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাওয়া এই বিদ্যুতের জন্য সরকারকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় করতে হবে।

রূপপুরের বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শনিবার যুগান্তরকে জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি কবে নাগাদ চালু হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (পিপিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা চূড়ান্ত হতে পারে। তবে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়, ঋণ পরিশোধের শর্ত এবং কেন্দ্রের সম্ভাব্য উৎপাদনকাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতি ইউনিটের দাম নিয়ে দুই ধরনের হিসাব

পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটি রূপপুর থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৭ মার্কিন সেন্টে কেনার হিসাব করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ টাকা ৭৫ পয়সা। তবে কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, এই হিসাবে কিছু ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিমা এবং অন্যান্য খরচ যোগ করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে রাখা কঠিন হতে পারে।

দাম নিয়ে মতপার্থক্যের অন্যতম কারণ কেন্দ্রটির সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৮০ বছর ধরে হিসাব করার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে, পিডিবি ৬০ বছরের উৎপাদনকাল বিবেচনায় নিয়ে একটি প্রতিবেদন বিদ্যুৎ বিভাগে জমা দিয়েছে।

সাধারণত কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল যত বেশি ধরা হয়, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রাথমিক বিনিয়োগের ব্যয় ভাগ করে দেখানোর সুযোগ তত বাড়ে। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের দাম নির্ভর করে ঋণের শর্ত, সুদ, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা এবং কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও। ফলে শুধু আয়ুষ্কালের হিসাব দিয়ে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটি কেন্দ্রটির জন্য কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার পক্ষেও নয়। সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ছাড়াও নির্দিষ্ট চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য যে অর্থ পরিশোধ করা হয়, সেটিই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিচিত। এই চার্জের বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে কীভাবে বিবেচিত হবে, তা বিদ্যুতের মোট ক্রয়ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

২০ বছরে ঋণ পরিশোধে ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার

সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিডিবির প্রাথমিক হিসাবে রূপপুর প্রকল্পে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এই অর্থের বিপরীতে ৪ শতাংশ সুদসহ ২০ বছরে সরকারকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত নয় মাসে প্রকল্পের অর্থ কোন খাতে এবং কী পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি তা দিতে পারেনি। এ অবস্থায় বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণে প্রয়োজনীয় সব তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকল্পের একটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং উৎপাদন দক্ষতা ৯০ শতাংশ ধরে হিসাব করা হয়েছে। সেই হিসাবে কেন্দ্রটির সম্ভাব্য বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিচালন ব্যয় এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সময়কাল বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রটির বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ২০ কোটি ডলার। এত বড় অঙ্কের নিয়মিত ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যয়ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের ২০ বছর শেষ হওয়ার পর বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় কমে প্রায় ৩ মার্কিন সেন্টে নেমে আসতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা নির্ভর করবে পরিচালন দক্ষতা এবং অন্যান্য ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তার ওপর।

ভারতের তুলনায় রূপপুরের বিদ্যুতের দাম বেশি

ভারতের নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ২ দশমিক ৫০ থেকে ৪ দশমিক ৫০ রুপির মধ্যে। অন্যদিকে, রূপপুরের বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।

তবে দুই দেশের বিদ্যুতের দাম সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রকল্পের নির্মাণব্যয়, ঋণের উৎস ও সুদের হার, পরিচালন ব্যয়, বিমা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়স এবং মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি এক না হলে শুধু ইউনিটপ্রতি মূল্য দিয়ে প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য পুরোপুরি বোঝা যায় না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময়মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের ঋণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ডলারের দাম বাড়লে স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিদ্যুতের চূড়ান্ত ক্রয়মূল্য কিংবা সরকারের আর্থিক দায়ের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানির নতুন চালান পৌঁছেছে রূপপুরে

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির আরেকটি চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় জ্বালানিবাহী গাড়িগুলো প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।

এর আগে সোমবার সকালে রাশিয়া থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে জ্বালানির চালান ভারতের দিল্লি হয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানটিতে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জ্বালানি বুঝে নেন।

জ্বালানির চালান পৌঁছানো প্রকল্পের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে জ্বালানি আসা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং অন্যান্য কারিগরি ধাপ সম্পন্ন করার পরই কেন্দ্রের কার্যক্রমের পরবর্তী পর্যায় এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

রূপপুরের বিদ্যুতের চূড়ান্ত দাম নির্ধারণে তাই শুধু উৎপাদনক্ষমতা বা জ্বালানির প্রাপ্যতা নয়, পুরো প্রকল্পের আর্থিক কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে। পিডিবি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনা শেষে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ইউনিটপ্রতি মূল্য, অর্থ পরিশোধের শর্ত এবং অন্যান্য আর্থিক দায় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category