বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার মামলায় তৎকালীন ডিআইজি মো. হুমায়ুন কবিরের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁর জবানবন্দিতে তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহর বিরুদ্ধে ওই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-২-এ রাষ্ট্রপক্ষ হুমায়ুন কবিরের তদন্ত সংস্থার কাছে দেওয়া জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের আবেদন করে। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি মঞ্জুর করেন। এদিন মামলার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণও সম্পন্ন হয়।
মামলার অভিযোগ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় একটি ফলবাহী গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়। ওই মামলায় তৎকালীন বরিশাল জেলার এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহর তদারকিতে উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ঢাকা ও কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে আগৈলঝাড়া এলাকায় তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে হুমায়ুন কবির বলেন, ঘটনার পর তিনি বিষয়টি জানতে পেরে তৎকালীন এসপি এহসানউল্লাহকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং ওই কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে ভর্ৎসনা করেন। পরে আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলামকে ডেকে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান তিনি।
ওসির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জবানবন্দিতে হুমায়ুন কবির বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টিপু ও কবিরকে গ্রেপ্তার করলেও এসপির নির্দেশে তাঁদের ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঠানো হয়। পরে তাঁদের ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ সদস্যরা এতে রাজি না হওয়ায় অন্য থানার পুলিশ সদস্যদের এনে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয় বলে ওসি তাঁকে জানিয়েছিলেন।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর এসপি এহসানউল্লাহর গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআরে বিরূপ মন্তব্যসহ সংযোজনী পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। তাঁকে বরিশাল রেঞ্জ থেকে অন্যত্র বদলির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়। পরে তাঁকে মাগুরায় বদলি করা হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে এহসানউল্লাহ অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান এবং আবার বরিশাল রেঞ্জে পদায়ন হন বলে জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির। এ ক্ষেত্রে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছিল বলে তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে।
মামলায় আসামি করা হয়েছে চারজনকে। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, তৎকালীন বরিশাল জেলার এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহ এবং উজিরপুর থানার সাবেক দুই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন।
আসামিদের মধ্যে হাসানাত আবদুল্লাহ ও এহসানউল্লাহ পলাতক রয়েছেন। মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং মঙ্গলবার তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা রাজনৈতিকভাবে হাসানাত আবদুল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। সাবেক ডিআইজি হুমায়ুন কবিরের জবানবন্দি মামলার সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ হবে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামিপক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার পর।