ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত বাস্কেটবল টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের প্যান্ট-জার্সি পরে মাঠে নামার সমালোচনা করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (আইএবি) আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, যিনি চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে এমন আয়োজনের মাধ্যমে তিনি ‘অসুন্দর পরিবেশ’ তৈরি করছেন।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কাকরাইলে আয়োজিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের ওয়ার্ড প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চরমোনাই পীর এসব কথা বলেন। সম্মেলনটি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ২৯ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
বক্তব্যে সাদিক কায়েমকে উদ্দেশ করে চরমোনাই পীর বলেন, ‘সাদিক কায়েম মেয়েদের প্যান্ট-জার্সি পরিয়ে মাঠে নামিয়ে অসুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করছে।’ তিনি আরও বলেন, ওই আয়োজনকে দেশের ইতিহাসে প্রথম হিসেবে তুলে ধরে গর্ব করার বিষয়টিও তাঁর কাছে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এমন আয়োজনের পরিবর্তন প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ‘জজবা’ বা তাগিদ থাকা দরকার।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে ডাকসুর উদ্যোগে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক জিমনেসিয়াম নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকার কথা জানানো হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াচর্চা বাড়ানোই ওই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে পোশাক ও ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্নেও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের বক্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে কারও পোশাক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে তাকে হেয় করা কিংবা সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।
নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়েও ডাকসুর অবস্থান নিয়ে আগে বক্তব্য দিয়েছেন সাদিক কায়েম। জানুয়ারিতে তিনি নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন এবং এসব ঘটনায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন।
সম্মেলনে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী বাস্কেটবল আয়োজন নয়, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন চরমোনাই পীর। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার জন্য মানুষ দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে গেলেও মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একই ধরনের নীতি ও কাঠামোয় দেশ পরিচালিত হতে থাকলে স্বাধীনতার হীরকজয়ন্তী কিংবা শতবর্ষ উদযাপন করা সম্ভব হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও সরকারকে দায়ী করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, লুটতরাজ, গুম ও খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অনাচার বাড়ছে এবং এসব নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, জনগণ বিভিন্ন দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেখেছে; কিন্তু প্রচলিত রাজনৈতিক নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব ইশতেহার দেয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেগুলোর অনেক প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শেখ ফজলে বারী মারুফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কেএম শরিয়তউল্লাহ।
এ সময় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যক্ষ শেখ ফজলে বারী মাসউদ, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলম, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আরিফুল ইসলামসহ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
চরমোনাই পীরের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া আয়োজন ও পোশাক নিয়ে আপত্তি, অন্যদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা। তাঁর বক্তব্যে এসব বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানও উঠে আসে।