সব পক্ষের মতামত নিয়ে সংবিধানে অংশগ্রহণমূলক ও ‘ইনক্লুসিভ’ সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের আলোচনার দরজা সবার জন্য খোলা। যারা এখনো কমিটির সঙ্গে যুক্ত হননি, তাদের নাম দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এমন একটি সংশোধনী প্রণয়ন করতে চান, যেখানে সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামতের প্রতিফলন থাকবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শুধু রাজনৈতিক দল নয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সামাজিক শক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও মতবিনিময় করা হবে। গত ১৭ বছরে গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার এবং জীবিত ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেও মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের বক্তব্যও শুনবে কমিটি।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং তাদের প্রতিনিধিদের মতামত সংগ্রহের পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। এসব মতামত ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পরে সেই প্রতিবেদনের আলোকে সংবিধান সংশোধনের বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সংসদে বিল উত্থাপনের পরও আলোচনা থেমে থাকবে না। সংসদের ভেতরের পাশাপাশি সংসদের বাইরের বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। আলোচনার ধারাবাহিকতায় সমঝোতার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রণয়ন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষ কমিটির বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র এবং সংবিধানে দেশকে ‘ইউনিটারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সুভারেন রিপাবলিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ব্যবস্থা না থাকায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনার একটি প্রস্তাব বৈঠকে এসেছে।
তবে একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছে, সেটিও সামনে রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ফলে এ বিষয়ে আলোচনায় সাংবিধানিক কাঠামো ও জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এর আগে বিশেষ কমিটির বৈঠকগুলোতেও সংবিধান সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নেওয়া হয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করে পরবর্তী ধাপে প্রতিবেদন তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
বৈঠকে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, এর প্রক্রিয়া কী হবে এবং কাঠামো কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপদ্ধতি ও কাঠামো নিয়ে আরও ‘ওপেন ডিসকাশন’ বা উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হবে। আলোচনার মাধ্যমে যে পদ্ধতিকে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হবে, সংসদ সেটি বিবেচনা করবে বলে জানান তিনি।
সংবিধান সংশোধনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে কমিটির এই অবস্থানের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, সামাজিক বিভিন্ন পক্ষের মতামত এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। আগামী ধাপে এসব মতামত কীভাবে প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় এবং সেখান থেকে কোন কোন সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত রূপ পায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, সংবিধান সংশোধনের প্রতিবেদন তৈরির পর সংশোধনী বিল সংসদে আনার প্রক্রিয়া এগোবে। মৌলিক কিছু সাংবিধানিক বিধানে পরিবর্তন এলে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে—এমন কথাও সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।