টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর নেতৃত্ব বাড়ানো, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ও মানবিক কার্যক্রমে ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ (ডব্লিউপিএস) এজেন্ডাকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি (ডব্লিউপিএস) ফোকাল পয়েন্টস নেটওয়ার্ক’-এর বার্ষিক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বৈঠকটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমের ফাঁকে ফিলিপাইন, ইতালি ও ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক রেজুলেশন ১৩২৫ গ্রহণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি আরও জোরদার করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত রেজুলেশনটি সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তিরক্ষা ও সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠনে নারীর পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে।
বৈঠকে শামা ওবায়েদ বলেন, ২০০০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে রেজুলেশন ১৩২৫ সমর্থনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই রেজুলেশনের ভোটাভুটিতে বাংলাদেশসহ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যই পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্বাধীন আগাম সতর্কতা ও মধ্যস্থতার উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়। সংঘাতের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে নারীদের সুরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন ধাপে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে ডব্লিউপিএস এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। রেজুলেশন ১৩২৫-এর মূল কাঠামোতেও নারীর অংশগ্রহণ, সুরক্ষা, সংঘাত প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডার সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। শান্তি ও নিরাপত্তার আলোচনাকে শুধু সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জলবায়ু সংকট ও মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত করার বিষয়টি বাংলাদেশের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে।
বৈঠকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান) প্রণয়নের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক অঙ্গীকারকে আরও কাঠামোবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর সহিংসতার বিষয়টিও আলোচনায় আনেন শামা ওবায়েদ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন ‘ঢাকা ডায়ালগ’ উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সাম্প্রতিক এক সংলাপেও এআই ব্যবহার করে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও অনলাইনে ঝুঁকির মুখে ফেলার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ সময় আসন্ন ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। নারীর নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বকে শান্তি ও নিরাপত্তার বৈশ্বিক আলোচনার আরও কেন্দ্রে নিয়ে আসাই এ ধরনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বৈঠকে গুরুত্ব পায়।