দীর্ঘ অপেক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া এগোতে শুরু করেছে। এখনো প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনে একটি প্রতিষ্ঠানের ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়ন হয়েছে। ফলে স্থগিত থাকা শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বাস্তবে এগোচ্ছে—এমন ইঙ্গিত মিলেছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) মালয়েশিয়ার সুপরিচিত সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির চাহিদার ভিত্তিতে ২৮ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র সত্যায়ন করে বাংলাদেশ হাইকমিশন। বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে ওই চাহিদাপত্রের সত্যায়ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করেছে।
এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে কিছু প্রশ্নও। কারণ শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো প্রকাশিত না হওয়ায় অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী বুঝতে পারছেন না—কবে থেকে আবেদন শুরু হবে, কারা আবেদন করতে পারবেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কোন পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
এর আগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনার পর শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানানো হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরুর লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল। পরে আগস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রস্তুতি চলছে।
মালয়েশিয়া থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে যুক্ত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আগস্টে মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি প্রধান রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেডের নামও ছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। অতীতের অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে, মাঠপর্যায়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। কেউ কেউ বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগ করছেন। কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে হবে কিংবা এখনই কোনো অর্থ দেওয়া যাবে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় বিভ্রান্তি বাড়ছে।
মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত সূত্রের ওপর নির্ভর করছেন। এতে দালালচক্রের মাধ্যমে প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এর আগেও মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশের আগে কর্মীদের টাকা না দেওয়া, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও গণমাধ্যমকে নিয়ে গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের কথাও তিনি জানিয়েছেন।
ফলে ২৮ কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়নের ঘটনাটি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অগ্রগতি হলেও, এটিকে পুরো শ্রমবাজারের জন্য আবেদন বা কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো নেই। মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশের পরই আবেদন, নিয়োগ, খরচ এবং কর্মী পাঠানোর পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহীদের মূল অপেক্ষা এখন সেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য। তারা চান, সরকার দ্রুত স্পষ্ট করে দিক—কোন পথে আবেদন করতে হবে, কত খরচ হবে এবং কীভাবে নিশ্চিত করা হবে যে নতুন করে কোনো অনিয়ম বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি না হয়।