বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। একই সঙ্গে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন ইয়াও ওয়েন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান (হাসান শিপলু) বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈঠকের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ এবং নিউইয়র্কে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সফলভাবে অংশ নেওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান চীনা রাষ্ট্রদূত। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময়ও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কারিগরি শিক্ষা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজারে শুল্কসুবিধা এবং বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, তৈরি পোশাক এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি চীনা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবন্ধিত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ অবকাঠামো ও বাণিজ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, সবুজ অর্থনীতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। ওই আলোচনায় বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, রংপুরে প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যার হাসপাতাল, শিক্ষা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
এর আগে জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন ইয়াও ওয়েন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের সহযোগিতার জন্য নতুন গতি তৈরি হয়েছে।
সোমবারের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং সংকটের টেকসই সমাধান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
চীন অতীতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিল। ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ইস্যুতেও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়াও ওয়েন ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মেয়াদ চলতি সেপ্টেম্বরেই শেষ হচ্ছে। দায়িত্ব শেষে তিনি বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেবেন।
বিদায়ের আগে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎ করছেন। ২০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতেও তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় চীনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইন।
বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের এই সাক্ষাতে একদিকে তার দায়িত্বকালের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির বার্তা এসেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ধারাবাহিকতা নিয়েও স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, মানবসম্পদ ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি এখন সামনে রয়েছে।