ফেনীর পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার ঘাটঘর এলাকার মুহুরী ব্রিজসংলগ্ন স্থানে প্রকল্পের ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গুপ্ত দলটি সবসময় জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।
তারেক রহমান বলেন, আইন সবার জন্য সমান—এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবে। তাঁর ভাষায়, বিএনপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়ন। এ প্রসঙ্গে তিনি খাল খনন, নদী ড্রেজিং, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল ও নদী খননের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ফেনীর এই অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা সম্ভব হবে এবং কৃষি উৎপাদন বছরে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফেনীর মুহুরী ও কহুয়া নদীসংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির পানিতে বন্যার সৃষ্টি হয়। নদীর পানি বেড়ে গেলে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের এই বন্যা, জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙনের সমস্যা কমানো।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গত ১৬ জুন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। কাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পটি শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নও যুক্ত রয়েছে। ফলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
মুহুরী-কহুয়া অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা প্রতিরোধ এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নতুন নয়। ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলে মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া, কালিদাস-পাহালিয়া ও ফেনী নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে পানি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সরকারি জেলা তথ্য অনুযায়ী, মূল মুহুরী সেচ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম ১৯৭৭-৭৮ সালে শুরু হয়ে ১৯৮৫-৮৬ সময়ে সম্পন্ন হয়।
বর্তমান প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মূল লক্ষ্য পুরোনো অবকাঠামোর পুনর্বাসন এবং নদী ও জলাধারের সক্ষমতা বাড়ানো। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একদিকে ফেনীর বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে কৃষিজমিতে নিয়মিত সেচ সুবিধা বাড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনার বিষয়টিকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
উদ্বোধনী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফলক উন্মোচনের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে বৃক্ষরোপণ করেন। পরে নদী ও খাল খনন কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করা হয়।