তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ আহ্বান জানান।
সাক্ষাতে তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন মোকাবিলা, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে নতুন করে সমর্থনের কথা জানানো হয়।
বৈঠকে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও উঠে আসে। রাষ্ট্রপতি এসব উদ্যোগকে বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রসঙ্গে কুনমিং-চট্টগ্রাম করিডর এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষীয় উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশ চীন ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৈরি পোশাক, বৈদ্যুতিক যান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর ও সৌরশক্তির মতো খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। এর আগে আগস্টে রাষ্ট্রপতি ও চীনা রাষ্ট্রদূতের এক বৈঠকেও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সে সময় রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অন্তত ৩০টি চীনা কোম্পানির প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন।
রোহিঙ্গা সংকটও বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে চীনের আরও সহযোগিতা চান রাষ্ট্রপতি। সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বেইজিংয়ের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে কার্যকর অগ্রগতিতে সহায়ক হবে।
স্বাস্থ্য খাতেও চীনের সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ ও অর্থায়নে চীনের সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে জনগণের জন্য উন্মুক্ত জটিল রক্তের ক্যান্সারের চিকিৎসায় চীনা বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহযোগিতা কামনা করেন। রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতিও আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। পাশাপাশি ২০২৬ সালের এপ্রিলে নিজের, বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থীদের চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের সফর, যোগাযোগ ও পারস্পরিক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের দায়িত্বকালীন অবদানের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি চিফ অব মিশন ড. লিই ইউইন।
তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার বিষয়টি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জুনে চীন প্রকাশ্যেই প্রকল্পটিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অবস্থান জানিয়েছিল। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পটির কারিগরি সম্ভাব্যতা ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।