মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অন্যান্য অপরাধীদের কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, অপরাধীর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় দেখার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয়—সে একজন অপরাধী।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা দেন আইজিপি। সভায় আগস্ট ২০২৬ মাসের দেশের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় আইজিপি বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। মাদক কারবারি ও এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন আইজিপি।
কিশোর অপরাধ নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, তাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং এসব অপরাধের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। পূজামণ্ডপ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পূজাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের গুজব, অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়েও পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলেন আইজিপি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের উসকানিমূলক বা বিভ্রান্তিকর প্রচার দেখা গেলে তা নজরদারির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সভায় গুরুত্ব পায়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান। তিনি কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে আরও কার্যকরভাবে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এসব অপরাধী চক্রের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে নিজ নিজ এলাকার জন্য পৃথক নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন সায়েদুর রহমান। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজব ছড়ানোর আশঙ্কার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় যথাযথভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সভায়। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় আগস্ট মাসের গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ডাকাতি, দস্যুতা, হত্যা, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণসংক্রান্ত মামলার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর, মামলার তদন্তের অগ্রগতি, বিচারাধীন মামলার অবস্থা এবং সাজার হার নিয়েও কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করেন।
সভায় মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, বিভিন্ন রেঞ্জের ডিআইজি এবং জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সভায় মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।