কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সড়কের পাশে খড় ও ঘাসের নিচ থেকে রাজা হোসেন (২৫) নামের এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু রিফাছ হোসেনকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে রিফাছ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
বুধবার সকালে উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর সাতবিল মাঠ এলাকায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় এক কৃষক মাঠে যাওয়ার সময় সড়কের পাশে কয়েকটি শিয়ালকে একটি বস্তু নিয়ে টানাটানি করতে দেখেন। তিনি কাছে এগিয়ে গেলে শিয়ালগুলো সরে যায়। পরে খড় ও ঘাস সরিয়ে সেখানে একজন যুবকের মরদেহ দেখতে পান তিনি। বিষয়টি স্থানীয়দের জানানো হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা স্যান্ডেল, হাতঘড়ি ও পরনের পোশাক দেখে পরিবারের সদস্যরা সেটি রাজা হোসেনের বলে শনাক্ত করেন। রাজা কামালপুর গ্রামের ইমাম আলীর ছেলে। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁর পরিবার দৌলতপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে।
মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ঝিনাইদহ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইমসিন দল ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
পুলিশের ভাষ্য, মরদেহ উদ্ধারের সময় সন্দেহভাজন চার যুবককে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রিফাছ হোসেন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে দাবি পুলিশের।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পুলিশ জানায়, রাজা হোসেনের কাছ থেকেই রিফাছ অনলাইন জুয়া খেলা শিখেছিলেন। পরে নিজেও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং এতে বড় অঙ্কের টাকা হারান বলে পুলিশ জানিয়েছে। আর্থিক সংকটে পড়ে সেই টাকা জোগাড়ের জন্য তিনি রাজাকে অপহরণ করে তাঁর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার রাজাকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাঁরা একসঙ্গে মাদক সেবন করেন। একপর্যায়ে জাল বা নেটজাতীয় বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধ করে রাজাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। এরপর মরদেহটি টেনে ঘটনাস্থলের পাশে নিয়ে খড় ও ঘাস দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
মরদেহটি আনুমানিক দুই দিনের পুরোনো হওয়ায় তাতে পচন ধরেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় নিহত রাজার বাবা ইমাম আলী বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় রিফাছ হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের পর হেফাজতে নেওয়া অপর তিন যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে একজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় রিফাছকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন জুয়ায় টাকা হারিয়ে রিফাছ আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সেই অর্থ জোগাড় করতে বন্ধুর কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয় এবং একপর্যায়ে রাজাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা, অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা এবং এতে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত ও ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।