• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫০ অপরাহ্ন

ছিনতাই থামছে না, মামলা-হিসাবে মিলছে না প্রকৃত চিত্র

newsline24 / ৩৩ Time View
Update : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
ছিনতাই থামছে না, মামলা-হিসাবে মিলছে না প্রকৃত চিত্র
ছিনতাই থামছে না, মামলা-হিসাবে মিলছে না প্রকৃত চিত্র

রাজধানী ঢাকায় ছিনতাই এখন শুধু অর্থ বা মুঠোফোন হারানোর ঘটনা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হচ্ছে প্রাণঘাতী অপরাধে। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়া, অস্ত্রের মুখে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, ছুরিকাঘাত কিংবা গুলি—বিভিন্ন কৌশলে ছিনতাইকারীরা আক্রমণ করছে পথচারী ও যাত্রীদের। এসব ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটছে।

সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট ভোরে চোখের চিকিৎসা করাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসা শিক্ষক রনজিলা পারভিন ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যান। ছিনতাইকারী তাঁর ব্যাগ টেনে নেওয়ার সময় তিনি চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে যান। একই ধরনের ঘটনায় গত জুনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম এবং প্রায় পাঁচ মাস আগে উত্তরায় মুক্তা আক্তার প্রাণ হারান।

তিনটি ঘটনাতেই ছিল প্রায় একই কৌশল। ভুক্তভোগীরা চলন্ত যানবাহনে ছিলেন, আর ছিনতাইকারীরা পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টান দেয়। আকস্মিক ওই টানে ভারসাম্য হারিয়ে তাঁরা রাস্তায় পড়ে যান। ফলে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা।

গত ছয় মাসে এ ধরনের তিনটি ঘটনায় নারীর মৃত্যু রাজধানীর সড়কে নিরাপত্তার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র শুধু প্রাণহানির ঘটনাগুলো দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, বহু ভুক্তভোগী থানায় মামলা করতে যান না। আবার কেউ থানায় গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা ‘হারানো’ জিডি নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুলিশের মামলার পরিসংখ্যান থেকে রাজধানীতে প্রকৃতপক্ষে কতটি ছিনতাই হচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া কঠিন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি। একই সময়ে ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৮টি। কিন্তু এসব মামলার সংখ্যা ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ মামলা না করায় অপরাধের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

গত ১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে ঘটে যাওয়া অন্তত ২২টি গুরুতর বা আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা পর্যালোচনা করলে অপরাধের ধরন ও ঝুঁকির একটি চিত্র পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। এমনকি চলন্ত ট্রেন থেকে যাত্রীকে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

এই ২২ ঘটনায় সরাসরি ভুক্তভোগী হিসেবে অন্তত ২৬ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী। সংখ্যার হিসাবে নারী ভুক্তভোগী কম হলেও তাঁদের ক্ষেত্রে পরিণতি ছিল তুলনামূলকভাবে ভয়াবহ। ২৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে চারটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যার তিনটিই নারী।

ঘটনাগুলোর স্থান বিশ্লেষণেও একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা দেখা যায়। আলোচিত ২২টি ঘটনার মধ্যে ৯টি ঘটেছে তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন এলাকায়। অর্থাৎ আলোচিত ছিনতাইয়ের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রাজধানীর এই পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে।

ছিনতাইকারীদের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে নগদ টাকা বহনকারী মানুষ। আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্তত আটটিতে ভুক্তভোগীর কাছে থাকা নগদ অর্থকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। তবে শুধু টাকা নয়, মুঠোফোন ও ব্যক্তিগত ব্যাগও ছিনতাইকারীদের অন্যতম টার্গেট।

যাতায়াতের সময় মানুষ যে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন, ঘটনাগুলোতেও তার ইঙ্গিত রয়েছে। অন্তত সাতটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা রিকশা, অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো যানবাহনে ছিলেন। দুটি ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন চলন্ত ট্রেনে। আরও দুটি ঘটনায় নারী ভুক্তভোগী বাসা বা গন্তব্যে পৌঁছে রিকশা থেকে নামার পরপরই ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন।

অর্থাৎ, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথে কিংবা গন্তব্যে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে মানুষকে লক্ষ্য করার প্রবণতা রয়েছে। চলন্ত যানবাহন থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়ার মতো কৌশলে অপরাধীরা মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাগ বা মুঠোফোনের জন্য এমন হামলা ভুক্তভোগীর জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে—সাম্প্রতিক প্রাণহানিগুলো তারই নির্মম উদাহরণ।

ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা, কোন এলাকায় কী ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে এবং কতগুলো ঘটনায় মামলা হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভুল পরিসংখ্যান না থাকায় অপরাধটির সামগ্রিক চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে না। ফলে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা সামনে এলেও প্রতিদিনের ছোট-বড় অসংখ্য ছিনতাই অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজধানীর সড়কে চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় কার্যকর আইনি পদক্ষেপ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category