দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ধাপে ধাপে ৫০০টি উপজেলায় কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষ মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এ পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
‘সামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য: অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজকল্যাণের সোপান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য এখন বিশ্বজুড়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। যুদ্ধ-সংঘাত, জীবনযাত্রার দ্রুত পরিবর্তন, একাকিত্ব এবং অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তি মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তবে অনেকেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর-কিশোরীরা এ সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডা. মুহিত বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প মানেই বড় ভবন নির্মাণ কিংবা দামি যন্ত্রপাতি কেনা নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও দক্ষ জনবল ছাড়া মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ ধরনের উন্নয়ন ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে সেবার মান ও জনবলের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং পাবনার মানসিক হাসপাতালের সেবার সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে তৃণমূল পর্যায়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে দক্ষ জনবলের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজের উপযোগী কর্মী তৈরিতে দুই থেকে তিন বছর মেয়াদি বৃত্তিমূলক ডিপ্লোমা বা কারিগরি কোর্স চালু করা প্রয়োজন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাঠামোর আওতায় মধ্যম পর্যায়ের মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা গেলে তাঁরা স্থানীয় মানুষের কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তায় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয় বলে মন্তব্য করেন ডা. মুহিত। এ ক্ষেত্রে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকার সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং তাঁদের প্রতি সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষের মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা না গেলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সাইদুর রহমান। আঁচল ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি), লিডোসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংগঠন যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।