কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে এসেছে মৃত্যুর আগে বাবার কাছে পাঠানো এক হৃদয়বিদারক বার্তা। গভীর রাতে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে বাবাকে দ্রুত গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করার অনুরোধ জানিয়েছিল তাজমিন। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় মেয়ের সেই বার্তা দেখতে পারেননি বাবা আব্দুল আলীম। সকালে মেসেজ দেখে লোকেশন অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেয়ের নিথর দেহ দেখতে পান তিনি।
নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাঁর মেয়ে। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে ওঠে তাজমিন। দীর্ঘ সময় মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে রাতে কয়েকবার ফোন করেন তিনি। কিন্তু তাজমিন ফোন না ধরায় পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
এরই মধ্যে রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে বাবার মুঠোফোনে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠায় তাজমিন। বার্তায় দ্রুত গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায় সে। তবে রাতের সেই বার্তা সকালে দেখতে পান আব্দুল আলীম। পরে লোকেশন অনুসরণ করে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেতে পৌঁছে দেখেন, পুলিশ তাঁর মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর আগের রাতে তাজমিনের চলাচলের কিছু তথ্য মহাসড়কের সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে। ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে সে।
এরপর হোটেলসংলগ্ন খাবার ও স্টেশনারি দোকানের সামনে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। রাত ১২টার দিকে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলে এবং মুঠোফোনে কিছু একটা দেখায় তাজমিন। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে হোটেল এলাকা ছেড়ে চলে যেতে দেখা যায়। তবে সেখান থেকে কীভাবে এবং কার সঙ্গে সে লালমাইয়ের জগতপুর গ্রামের নির্জন ধানক্ষেতে পৌঁছায়, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে অটোরিকশা
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে স্থানীয় লোকজন জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেতে তাজমিনের মরদেহ দেখতে পান। ঘটনাস্থলের অন্তত চার থেকে পাঁচটি জমির ধানগাছ তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে সেখানে ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহের পাশেই পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কিছু দূরে পাওয়া যায় তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করা হলেও পরে পরিবারের সদস্যরা এসে পরিচয় শনাক্ত করেন।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ ও নির্যাতনের বিষয়ে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রয়োজন।
হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের অভিযান
ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বর এবং বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশের একাধিক দল। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে মাঠপর্যায়ে অভিযান চলছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, বাস থেকে নামার পর তাজমিনের চলাচলের প্রতিটি সূত্র ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। কীভাবে সে ধানক্ষেতে পৌঁছাল এবং কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
বাবার কাছে পাঠানো শেষ বার্তাটি তাজমিনের মৃত্যুর আগের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। তবে ওই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত এবং কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের অপেক্ষায়।