রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয় এবং এই সংকটের ভার চিরকাল বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিরসন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
শনিবার ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড বলরুমে ‘দ্য ফার্স্ট কনভারসেশন: আ ওয়ার্ল্ড রিরাইটেন—পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন দ্য এজ অব আনসার্টেনটি’ শীর্ষক উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা বলেন তিনি। শামা ওবায়েদ ইসলাম ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বহুমুখী ও জটিল পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বসবাসরত তরুণ রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ লাখের বেশি এবং বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্মের তথ্য উঠে এসেছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত শুধু মানবিক সংকটই বাড়াচ্ছে না, বাংলাদেশের সীমান্তেও নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করছে। ফলে বিষয়টি কেবল শরণার্থী ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরে সংকট নিরসনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির ওপর কার্যকর প্রভাব ও চাপ তৈরিতে চীন কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপরও জোর দেওয়া হয়। তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। আসিয়ানভুক্ত দেশ, পশ্চিমা রাষ্ট্র, ইসলামিক দেশসহ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে শিবিরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন করে আগমন, মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে; তাদের একটি অংশ ভাসানচরেও বসবাস করছে।
এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি মিয়ানমারের সংকটের রাজনৈতিক সমাধানকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।