• রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
‘সাপকে বিশ্বাস করবেন, জামায়াতকে নয়’: ফজলুর রহমান কৃষকদের স্বীকৃতিতে জাতীয় পুরস্কারের উদ্যোগ রাষ্ট্রপতির বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় স্কুলছাত্রী হত্যা, ১৯ বছর পর আসামির ফাঁসি ‘বেয়াদব ডেঙ্গু মশা এখন দিনে কামড়ায়, রাতেও কামড়ায়’ খাল বাঁচাতে ঢাকায় বড় উদ্যোগ, ৫৫ খালের পাশে নির্মাণ হবে ওয়াকওয়ে নারায়ণগঞ্জে দিনদুপুরে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি, গ্রেপ্তার ৫ ২৭ বছর পর ধরা পড়লেন এরশাদ শিকদারের সহযোগী জয়নাল বোয়িং কেনায় বাংলাদেশের স্বার্থ, মাহদী আমিনের স্পষ্ট বার্তা দুষ্কৃতকারীর দলীয় পরিচয় দেখবে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘বিএনপি চাঁদাবাজ দল’—সালমানের অভিযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব

মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার স্বর্গরাজ্য, সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ

newsline24 / ১৩ Time View
Update : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার স্বর্গরাজ্য, সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ
মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার স্বর্গরাজ্য, সর্বস্বান্ত সাধারণ মানুষ

মোবাইল ফোনের পর্দায় কয়েকটি ক্লিক। এরপরই বড় অঙ্কের টাকা জেতার প্রলোভন। দ্রুত অর্থবিত্তের স্বপ্ন দেখিয়ে মেহেরপুরে ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার কারবার। তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একদিকে এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশ বিপুল অর্থ আয় করছে, অন্যদিকে জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকেই হারাচ্ছেন ব্যবসার মূলধন, সঞ্চয় ও সহায়-সম্পদ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে জেলায় একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মের হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করা, টাকা লেনদেন এবং জুয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রীর পত্নী মনালিসা, আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এবং প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তাকে ঘিরে এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

এজেন্ট আটক, থামছে না কারবার

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছোটখাটো এজেন্টদের আটক করা হয়েছে। মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছে কয়েকজন। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন—মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি মূল নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে এই কারবার বন্ধ হবে কীভাবে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে অনেকে আবার একই কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। একজন এজেন্ট ধরা পড়লে তার জায়গায় নতুন কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন। ফলে ব্যক্তি বদলালেও জুয়ার নেটওয়ার্ক কার্যত সচল থাকছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত অনলাইন জুয়া-সংশ্লিষ্ট আইনে মেহেরপুরে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৩ জনকে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আটক হয়েছেন ১৫ জন।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার দাস বলেন, অনলাইন জুয়া-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পারিবারিক অশান্তি

অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত অর্থনীতি ও পরিবারে। শুরুতে অল্প টাকা দিয়ে খেলা শুরু করলেও জেতার আশায় অনেকে ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছেন। একপর্যায়ে হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ ঝুঁকিতে ফেলছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ ব্যবসার মূলধন হারিয়েছেন, কেউ চাকরি হারিয়ে ঋণের বোঝা টানছেন। আবার কেউ সহায়-সম্পদ বিক্রি করেও ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেননি। ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে অশান্তি। বেড়েছে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের ঘটনাও বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

জুয়ার কারণে ঋণের চাপ, হতাশা এবং পারিবারিক সংকট থেকে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার সরাসরি সম্পর্ক পৃথকভাবে তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়।

মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ মুহা. আব্দুল্লাহ আল আমিন ধূমকেতু বলেন, ‘মেহেরপুরকে মনে করা হয় অনলাইন জুয়ার স্বর্গরাজ্য। এর ফাঁদে পড়ে মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।’

মূল হোতারা কারা, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

অনলাইন জুয়ার কারবার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু এজেন্ট গ্রেপ্তার করে এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, স্থানীয় এজেন্টদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখছে, অর্থের লেনদেন কোন পথে হচ্ছে এবং এর পেছনে কারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন—এসব বিষয় খুঁজে বের করা জরুরি।

পুলিশের দেওয়া মামলার তথ্য থেকে বোঝা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পরও নতুন করে একই কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থায়ী সমাধান মিলছে না।

মেহেরপুরবাসীর প্রত্যাশা, কেবল মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের গ্রেপ্তারের মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে অনলাইন জুয়ার পুরো নেটওয়ার্কের আর্থিক ও সাংগঠনিক কাঠামো খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

কয়েকটি ক্লিকে বড় অঙ্কের টাকা পাওয়ার যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, তার বিপরীতে বাস্তবে বহু মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে শুধু গ্রেপ্তার নয়, এই কারবারের উৎস, অর্থের প্রবাহ এবং নেপথ্যের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category