শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলমখার কান্দী এলাকায় আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পদ্মার ভাঙন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নদীর তীব্র স্রোতে মালয়েশিয়া প্রবাসী জুলহাস খানের বসতবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় থেকে উপার্জন করা অর্থে নির্মিত বাড়িটি চোখের সামনে হারিয়ে পরিবারটির মধ্যে নেমে এসেছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে আলমখার কান্দী এলাকায় ভাঙন তীব্র হচ্ছে। প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। গত কয়েক দিনে এলাকাটিতে ২০০ মিটারের বেশি নদীতীর বিলীন হয়েছে বলে দাবি তাদের। এতে শুধু বসতবাড়ি নয়, দোকানপাট, ফসলি জমি ও স্থানীয় সড়কও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ভাঙন বাড়তে থাকলে জুলহাস খানের বাড়ির একটি অংশে ধস নামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নদী বাড়িটির কাছে চলে আসে এবং একপর্যায়ে পুরো বসতবাড়িটি পদ্মার গর্ভে চলে যায়। আকস্মিক এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভাঙনের আশঙ্কায় আশপাশের অনেক পরিবার এখন ঘরের টিনের চাল, দরজা-জানালা, আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় কয়েকটি পরিবার রাত জেগে নিজেদের বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে।
আলমখার কান্দীর বাসিন্দা আক্কাস মিয়া বলেন, পদ্মা যেভাবে ভাঙছে, তাতে সামনে আরও অনেক বাড়িঘর নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জাজিরায় পদ্মার ভাঙন অবশ্য নতুন নয়। এর আগে গত ১০ আগস্ট পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া কান্দি এলাকায় কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ১১০ মিটার নদীতীর বিলীন হয়ে যায়। তখন ভাঙনের মুখে অন্তত ১০টি বসতঘর ও ছয়টি দোকান সরিয়ে নিতে হয়েছিল। স্থানীয়দের যোগাযোগের একমাত্র সড়কেরও বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কাথুরিয়ার পাশাপাশি পালেরচরের ফরাজীকান্দি এবং পূর্ব নাওডোবার পৈলান মোল্যারকান্দিসহ কয়েকটি নদীতীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও বসতভিটার অংশ নদীতে চলে গেছে, কোথাও আবার সড়ক, ফসলি জমি ও দোকানপাট হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে জাজিরায় পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীতীর সুরক্ষায় তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের একটি অংশের নকশা পরিবর্তন এবং প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের অনুমোদন পেতে সময় লাগায় কাজ নির্ধারিত সময়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই অংশের কাজের জন্য প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে অংশটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে তারা অবগত আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি যেসব এলাকায় এখন ভাঙন শুরু হয়েছে, সেখানে জিওব্যাগসহ জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাজিরার আরও বহু পরিবার বসতভিটা