পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বুধবার সকাল থেকেই উৎসবের আবহে রূপ নেয় চট্টগ্রাম নগরী। ভোরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় হামদ, নাত, তাকবির, দরুদ শরিফ ও জিকিরের আয়োজন শুরু হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নগরের ষোলশহর এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। একপর্যায়ে সেখানে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হয় বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে নগরের ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস বের করা হয়। এতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নানা বয়সী মানুষ অংশ নেন। কেউ পায়ে হেঁটে, আবার কেউ ট্রাক ও পিকআপে করে জুলুসে যোগ দেন।
জুলুসকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় আগেই সাজানো হয়। প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন এলাকায় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের সুবিধার জন্য পথের বিভিন্ন স্থানে বিশুদ্ধ পানি, শরবত ও শুকনা খাবার বিতরণ করতেও দেখা যায়।
চট্টগ্রামে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জশনে জুলুস আয়োজনের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (রহ.) ওই বছর এই আয়োজনের প্রবর্তন করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর ১২ রবিউল আউয়াল আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এবার ছিল এই আয়োজনের ৫৬তম পর্ব। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই কর্মসূচি চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে একটি পরিচিত আয়োজন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
এবারের জুলুসে নেতৃত্ব দেন আওলাদে রাসুল (সা.) সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মাজিআ)। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও সৈয়দ মুহাম্মদ আকিন আহমদ শাহ।
ষোলশহর জামেয়া মাদ্রাসা মাঠ থেকে শুরু হওয়ার পর জশনে জুলুসটি নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। নির্ধারিত পথের মধ্যে ছিল বিবিরহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা মোড়, লালখান বাজার ও টাইগারপাস। পরে একই পথ ধরে জুলুসটি আবার মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ফিরে আসে।
জুলুস চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা হামদ, নাত, দরুদ শরিফ ও জিকিরে অংশ নেন। আয়োজনস্থলে কোরআন তেলাওয়াত ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পীর আল্লামা সাবির শাহ বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্টিজগতের জন্য নেয়ামত। তাঁর মতে, নবীজির আগমন উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা কোরআন ও হাদিসে স্বীকৃত।
তিনি বলেন, জশনে জুলুসের কর্মসূচিতে কোরআন তেলাওয়াত, নাতে রাসুল (সা.) পাঠ এবং মহানবীর সীরাত আলোচনা করা হয়। তাঁর বক্তব্যে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের ধর্মীয় তাৎপর্যও তুলে ধরা হয়।
বিপুল মানুষের অংশগ্রহণের কারণে জশনে জুলুস ঘিরে নগর পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জুলুসস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ এবং গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়।
জুলুসের সময় নগরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প পথে যানবাহন চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ছুটির দিন হওয়ায় যানজট পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বিপুল মানুষের সমাগম সত্ত্বেও জুলুসের পুরো কর্মসূচি নির্ধারিত পথে অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন স্থানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাবার ও পানীয় সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল।
অনুষ্ঠানে আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মনজুর আলম, সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, এডিশনাল সেক্রেটারি আলহাজ শামসুদ্দিন, ফাইন্যান্স সেক্রেটারি মোহাম্মদ কমর উদ্দীন (সবুর), প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন সেক্রেটারি মোহাম্মদ গোলাম মহিউদ্দীনসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। গাউসিয়া কমিটির নেতৃবৃন্দও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের এই আয়োজনকে ঘিরে সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় আলোচনা, নাত, জিকির ও জুলুসের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করেন অংশগ্রহণকারীরা।