জামালপুরের সরিষাবাড়ী ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার দুই হাজারের বেশি গ্রাহকের প্রায় ৪০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুটি সমবায় সমিতির মালিকদের বিরুদ্ধে। সয়া বাজারে অবস্থিত ‘গ্রামীণ সেবা ঋণদান সমবায় সমিতি’ ও ‘একতা ঋণদান সমবায় সমিতি’ নামের প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যালয় বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এতে নিজেদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম এবং পাশের ধনবাড়ী উপজেলার বাসিন্দাদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় সংগ্রহ করছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এবং বিভিন্ন মেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্পের কথা বলে সাধারণ মানুষকে টাকা জমা রাখতে উৎসাহিত করা হতো। অনেকেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও বাড়তি আয়ের আশায় নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে জমা রাখেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই সমিতি দুটির কার্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে মালিকপক্ষের খোঁজ না পেয়ে এবং জমা টাকা ফেরত না পেয়ে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ৪০ কোটি টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রামীণ সেবা ঋণদান সমবায় সমিতির মালিক লতিফ মিয়া। অন্যদিকে একতা ঋণদান সমবায় সমিতির মালিক রফিকুল ইসলাম রফিক ও শামছুল হক। ঘটনার পর থেকে তাঁদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে ৩১ অক্টোবর (শনিবার) মধ্যরাতে। ওই সময় বন্ধ থাকা একতা ঋণদান সমবায় সমিতির কার্যালয় থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন রফিকুল ইসলাম রফিকের বেয়াই হাবিল মিয়া। বিষয়টি স্থানীয় গ্রাহকদের নজরে এলে তাঁরা হাবিল মিয়াকে আটক করে সমিতির কার্যালয়ে আটকে রাখেন। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সরিষাবাড়ী ও ধনবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা সেখানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ধনবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আটক হাবিল মিয়াকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে সমিতির মালিকদের অবস্থান কিংবা গ্রাহকদের টাকা উদ্ধারের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে টাকা হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়েছেন অনেক গ্রাহক। ভুক্তভোগী নিলুফা ইয়াসমিন, শফিকুল ইসলাম, জয়নব বেওয়া, স্বপ্না বেগম, নূরজাহান বেগম, ফারুক মিয়া, মোস্তফা মোজাম্মেল ও মৌটুসি বেগমসহ অনেকে জানিয়েছেন, তাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমে জমানো অর্থ এসব সমিতিতে রেখেছিলেন। এখন মূল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, দ্রুত অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, সমবায় সমিতিতে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় জমা রাখার প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা কিংবা তুলনামূলক কম আয়ের অনেক মানুষ নিয়মিত সঞ্চয়ের জন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন। ফলে কোনো সমিতির কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।
এ ঘটনায় গ্রাহকদের অর্থের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ, সমিতি দুটির আর্থিক লেনদেনের হিসাব যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, আর্থিক কার্যক্রম ও তদারকি কতটা নিয়মিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সংখ্যা এবং অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আপাতত সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে দুই উপজেলার দুই হাজারের বেশি গ্রাহকের।