কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ থাকলেও ইউনিয়নভেদে কাজের দৃশ্যমানতায় রয়েছে বড় পার্থক্য। এর মধ্যে প্রকল্পের বরাদ্দ পেতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়—এমন অভিযোগও উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিআইও। উপজেলা প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারাও কমিশন নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকার কথা জানাননি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে সৌর বিদ্যুৎ, সোলারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু এসব বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, কোন ইউনিয়নে কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কারের অভাবে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। কোথাও রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী, কোথাও সড়ক সংস্কার জরুরি। আবার কিছু এলাকায় উন্নয়নকাজের দৃশ্যমানতা তুলনামূলক বেশি হলেও অন্য কয়েকটি ইউনিয়নে বরাদ্দের তুলনায় কাজ কম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে হোগলবাড়ীয়া ও দৌলতপুর সদর ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি উন্নয়নকাজের চিত্র পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে কয়েকটি ইউনিয়নে একই সময়ের বরাদ্দের তুলনায় দৃশ্যমান উন্নয়ন কম—এমন দাবি স্থানীয়দের।
এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, ১৪টি ইউনিয়নে প্রকল্প বণ্টনের ভিত্তি কী? কোন এলাকায় কোন প্রকল্প নেওয়া হবে, কত টাকা বরাদ্দ হবে এবং কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়নকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো কমিশন দাবির। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্পের বরাদ্দ পেতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়।
বিশেষ করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, কমিশন ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় না। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কথিত কমিশনের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। পিআইও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।
প্রকল্পের ধরন ও বরাদ্দ নির্ধারণে উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, কমিশনের অভিযোগকারীকে তাঁর সামনে নিয়ে আসা হলে বিষয়টি দেখা যাবে। তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটি রয়েছে এবং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী বাচ্চু জানান, দৌলতপুরে তাঁর যোগদানের বয়স প্রায় পাঁচ মাস। দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো তথ্য তাঁর কাছে আসেনি। তবে প্রকল্পের নীতিনির্ধারণে উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।
ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী, হোগলবাড়ীয়া, রিফাইতপুর, খলিসাকুন্ডী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার স্বজীব হোসেনের কাছে প্রকল্প ও বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, কোন ইউনিয়নে কী ধরনের প্রকল্প হবে এবং কোথায় কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ের সিনিয়র উপজেলা প্রকৌশলী নীতিনির্ধারণ করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্প নির্বাচন ও কাজের ধরন নির্ধারণে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন শুধু কমিশনের অভিযোগ নিয়ে নয়। তাদের বড় উদ্বেগ হলো, জনগণের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ বাস্তবে কতটা জনগণের কাজে লাগছে।
তাদের ভাষ্য, কোনো এলাকায় প্রকল্পের বরাদ্দ থাকলেও যদি মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমানতা না থাকে, তাহলে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। একইভাবে একটি ইউনিয়নে বেশি এবং অন্য ইউনিয়নে কম প্রকল্প কেন নেওয়া হয়েছে, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে নেওয়া সব প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হোক। প্রকল্পের নাম, বরাদ্দের পরিমাণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য, অনুমোদিত ব্যয়, কাজের অগ্রগতি, বিল উত্তোলন এবং প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন তারা।
উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়ম, প্রকল্প নির্বাচনে বৈষম্য কিংবা কমিশন নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে মানুষের আস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
দৌলতপুরের ১৪টি ইউনিয়নের উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির। সরকারি অর্থে নেওয়া প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের অগ্রগতি এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হলে কমিশনের অভিযোগের সত্যতা, প্রকল্প বণ্টনের যৌক্তিকতা এবং মাঠপর্যায়ের উন্নয়নকাজের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। পিআইও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অনিয়মের তথ্য থাকার কথা জানাননি। তাই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের নথিপত্র, আর্থিক হিসাব ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।