ফুটবল ইতিহাসে কিছু জার্সি কেবল খেলার পোশাক নয়, হয়ে ওঠে একটি যুগের পরিচয়। পর্তুগালের ৭ নম্বর জার্সিও তেমনই এক প্রতীক। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে এই জার্সি গায়ে মাঠ মাতিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গোল, রেকর্ড, শিরোপা আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তে সমৃদ্ধ করেছেন দেশের ফুটবল ইতিহাস। এবার সেই পরিচিত জার্সিকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক আবেগঘন বার্তায় নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। এর মধ্য দিয়ে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১৪৬টি গোল করেছেন রোনালদো। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড—দুটিই তাঁর দখলে। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় দলকেও এনে দিয়েছেন বড় সাফল্য। ২০১৬ সালে পর্তুগালের প্রথম ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয় এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
তবে এমন এক কিংবদন্তির বিদায় যে এতটা আবেগঘন হবে, তা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের কোচের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ, ম্যাচে সুযোগ না পাওয়া এবং দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে সতীর্থদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এবার সেই অধ্যায়ের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন তিনি।
৭ নম্বর জার্সি তুলে দিতে চান নতুন প্রজন্মের হাতে
বিদায়বার্তায় রোনালদো জানিয়েছেন, পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ৭ নম্বর জার্সিটি এবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে জার্সি তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল, সেটির প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগাল জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেছে। কখনোই মনে করিনি, জার্সিটি শুধু আমার একার ছিল। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর প্রতিনিধিত্ব করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে এটি গায়ে নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ ও দায়িত্ব পেয়েছি আমি।’
সিদ্ধান্তটি যে তাঁর জন্য সহজ ছিল না, সেটিও স্পষ্ট করেছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। তাঁর ভাষায়, ‘আজ সময় এসেছে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয় দিয়েও নিতে হয়।’
২০০৩ সালে শুরু, ২৩ বছরের অবিস্মরণীয় পথচলা
পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল ২০০৩ সালের ২০ আগস্ট। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। অভিষেকের পর ধীরে ধীরে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। সময়ের সঙ্গে শুধু দলের অধিনায়কত্বই পাননি, হয়ে উঠেছেন পর্তুগালের ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরিচয়গুলোর একটি।
দীর্ঘ এই যাত্রায় ছয়টি বিশ্বকাপ এবং পাঁচটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছেন রোনালদো। ২০১৬ সালের ইউরো জয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হলেও সাইডলাইন থেকে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পর্তুগালের শিরোপা জয়ের আনন্দে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকেন এই তারকা।
এরপর ২০১৯ সালে প্রথমবার এবং ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার নেশনস লিগের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। দুই শিরোপা জয়ের পথেও রোনালদোর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
নিজের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং আমার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটল। জাতীয় দলের হয়ে কাটানো সময়ের দিকে ফিরে তাকালে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথাই মনে পড়ে না।’
সমর্থকদের ভালোবাসাকেই বড় প্রাপ্তি মনে করেন রোনালদো
বিদায়বার্তায় পর্তুগালের মানুষের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এই ফুটবল কিংবদন্তি। তাঁর কাছে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা কেবল মাঠের সাফল্য কিংবা ব্যক্তিগত রেকর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি গভীর টান।
রোনালদো বলেন, ‘আমি মানুষকে দেখি, বিদেশে বসবাস করা পর্তুগিজদের দেখি, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও দেশকে আরও কাছাকাছি অনুভব করতেন। এমন লাখো পর্তুগিজ মানুষের কথা মনে পড়ে, যাদের কখনো সামনাসামনি দেখিনি, অথচ তারা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছেন।’
ফুটবল যে কেবল একটি খেলা নয়, মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে এর যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘দিন শেষে ফুটবল একটি খেলার চেয়ে অনেক বড় কিছু। ফুটবল মানুষের জন্য, মানুষের আবেগের জন্য।’
রোনালদোর বিদায়ে পর্তুগাল জাতীয় দল হারাতে যাচ্ছে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী ফুটবলারকে। তাঁর ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল কিংবা অসংখ্য রেকর্ড পরিসংখ্যানের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু সমর্থকদের কাছে ৭ নম্বর জার্সি গায়ে তাঁর গোল উদ্যাপন, মাঠে নেতৃত্ব এবং কঠিন মুহূর্তে দলের পাশে থাকার স্মৃতিগুলোই হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে।