লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনায় দুই বিএসএফ সদস্যের দুটি শর্টগান ও একটি ওয়াকিটকি ফেলে ভারতে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে স্থানীয় কৃষকেরা উদ্ধার করা অস্ত্র ও যোগাযোগের যন্ত্রটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের কাছে জমা দেন। রাতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সেগুলো আবার বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্তের প্রধান পিলার ৯০৭-এর ২ নম্বর উপপিলারের কাছে কয়েকজন বাংলাদেশি কৃষক তাঁদের জমিতে কাজ করছিলেন। এ সময় ভারতের ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলীমারী ক্যাম্পের একটি টহল দলের তিন সদস্য সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অংশে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বিএসএফ সদস্যদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি ধস্তাধস্তিতে গড়ায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ধস্তাধস্তির সময় বাংলাদেশি কৃষকদের একজন বিএসএফ সদস্যের অস্ত্র ধরে ফেলেন। আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে বিএসএফ সদস্যরা দুটি শর্টগান ও একটি ওয়াকিটকি ফেলে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকে চলে যান বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার করা অস্ত্র ও ওয়াকিটকিটি বিজিবির বনচৌকি ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার শরিফুল ইসলামের কাছে সেগুলো জমা দেওয়া হয়। সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা নিয়ে যাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি না হয়, সে জন্য পরবর্তীতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
মঙ্গলবার রাতেই সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম। ভারতের পক্ষে ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট মনোজ কুমার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে বিজিবির কাছে থাকা বিএসএফের দুটি শর্টগান ও একটি ওয়াকিটকি তাদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। পাশাপাশি সীমান্তে কৃষকদের স্বাভাবিকভাবে কৃষিকাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং তাঁদের কাজে যাতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয় আলোচনায় আসে। এর মধ্যে পুশইন ঠেকানো এবং মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কৃষক লিটন মিয়া বলেন, সীমান্তের জমিতে তাঁর বাবা ও ভাই কাজ করছিলেন। তাঁদের খাবার দিতে তাঁর মা সেখানে গেলে পরে তিনি মাকে ডাকতে যান। ওই সময় তিনি কয়েকজন বিএসএফ সদস্যকে বাংলাদেশের জমির ওপর দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখেন।
লিটনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশে প্রবেশের কারণ জানতে চাইলে তাঁর সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তখন তিনি একজন বিএসএফ সদস্যের রাইফেলের মাথা ধরে ফেলেন। পরে তাঁর বাবা ও ভাই এগিয়ে এলে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং বিএসএফ সদস্যরা অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেলে সীমান্তের ওপারে চলে যান।
সীমান্তের প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষিজমি নিয়ে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত ও কাজকর্মের কারণে মাঝেমধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমঝোলের ঘটনাটিও শেষ পর্যন্ত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং উদ্ধার হওয়া বিএসএফের অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ফেরত দেওয়া হয়েছে।