ফরিদপুরের সালথায় পরকীয়া সম্পর্কের জেরে স্বামী নুরুল ইসলামকে হত্যার দায়ে তার স্ত্রী মুন্নি বেগম ও মাহাবুব মোল্যাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দুই আসামিকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজের বিশেষ পারিবারিক আদালতের বিচারক অশোক কুমার দত্ত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি মুন্নি বেগম আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপর আসামি মাহাবুব মোল্যা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মুন্নি বেগমের বয়স ২৪ বছর। তিনি সালথা উপজেলার পুরুরা সরদারপাড়া গ্রামের নিহত নুরুল ইসলামের স্ত্রী। একই গ্রামের কাশেম মোল্যার ছেলে মাহাবুব মোল্যা ছিলেন এ মামলার অপর আসামি। নুরুল ইসলাম ওই এলাকার আব্দুল মান্নান মোল্যার ছেলে এবং সালথা বাজারে মুদি ব্যবসা করতেন।
মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, মুন্নি বেগম ছিলেন নুরুল ইসলামের চতুর্থ স্ত্রী। তাদের সংসারে পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে ও এক বছর বয়সী একটি মেয়ে ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, মুন্নি পাশের বাড়ির চাচাতো দেবর মাহাবুব মোল্যার সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে ওই সম্পর্কের জেরে মুন্নি ও মাহাবুব একসঙ্গে পালিয়ে যান। পরে পারিবারিক ও সামাজিক চাপে পরকীয়া সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্তে মুন্নি স্বামীর কাছে ফিরে আসেন। নুরুল ইসলামও তাকে গ্রহণ করেন। তবে আদালতের নথি ও মামলার তদন্ত অনুযায়ী, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ রাতে মুন্নি বেগম হরলিক্সের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে স্বামীকে পান করান। এরপর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে একই কক্ষে দুই খাটে ঘুমাতে যান তারা।
মাঝরাতে মুন্নি দেখতে পান ঘরের দরজা খোলা। নুরুল ইসলামকে ঘরের ভেতরে না পেয়ে তিনি বাইরে খুঁজতে বের হন। পরে ঘরের পেছনে রক্তাক্ত অবস্থায় নুরুলকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করেন। তার চিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্য ও স্বজনরা এগিয়ে আসেন।
নুরুল ইসলামের মাথার বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পরদিন সকালে নিহতের বাবা মান্নান মোল্যা বাদী হয়ে সালথা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে। একপর্যায়ে নিহতের স্ত্রী মুন্নি বেগমের সঙ্গে মাহাবুব মোল্যার ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে তাদের একাধিক রঙিন ছবি উদ্ধার হয়। সেই সূত্র ধরে মুন্নিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুন্নি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাহাবুবের সম্পৃক্ততার কথা জানান বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, পরকীয়া সম্পর্কের পথে স্বামীকে ‘পথের কাঁটা’ হিসেবে দেখছিলেন তারা। মাহাবুবের পরামর্শ অনুযায়ী দুজন মিলে নুরুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং ঘটনার রাতে তা বাস্তবায়ন করেন বলে তদন্তে বলা হয়।
তদন্ত শেষে পুলিশ মুন্নি বেগম ও মাহাবুব মোল্যাকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন এবং তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এ ছাড়া প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করলে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌশলী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান বিকু জানান, পুলিশি তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত মুন্নি বেগমকে পুলিশ পাহারায় কারাগারে পাঠানো হয়। আর পলাতক মাহাবুব মোল্যাকে গ্রেপ্তারের জন্য আদালত পরোয়ানা জারি করেছেন।