
ফুটবল ইতিহাসের সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়, তা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে চালু করা হয় এই বিশেষ পুরস্কার। প্রথম আয়োজনেই রোনালদো ও মেসির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে, দুই তারকার ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলো এখনো ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২০০৮ সাল ছিল রোনালদোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে সে মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি। গোল করার পাশাপাশি দলের আক্রমণভাগে তাঁর গতি, ড্রিবলিং, হেডে গোল করার দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান ইউনাইটেডকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়।
ওই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪২টি গোল করেন রোনালদো। তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। একই মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগও জয় করে দলটি। ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও দলীয় সাফল্যের সমন্বয় রোনালদোকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদারে পরিণত করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জেতেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড। পরবর্তী সময়ে আরও চারবার এই পুরস্কার জিতে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে। তাঁর প্রথম ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুমকে এবার সর্বকালের সেরা হিসেবে নির্বাচিত করা সেই সাফল্যেরই আরেকটি স্বীকৃতি।
রোনালদোর পরের অবস্থানে রয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি। ভক্তদের ভোটে মেসির ২০১২ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও গোল করার অসাধারণ সামর্থ্যের কারণে বছরটি মেসির ক্যারিয়ারে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
২০১২ সালে মেসি এক পঞ্জিকাবর্ষে ৯১টি গোল করে বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ক্লাব বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে তাঁর এই গোলসংখ্যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিগত রেকর্ড। একই বছর ব্যালন ডি’অর জিতে টানা চতুর্থবারের মতো পুরস্কারটি নিজের করে নেন তিনি।
রোনালদো ও মেসির সাফল্যের ধরনে পার্থক্য থাকলেও দুজনই দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত পুরস্কার, গোলের রেকর্ড এবং ক্লাব পর্যায়ের সাফল্য আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। বিওএটি ভোটে প্রথম দুই স্থান এই দুই তারকার দখলে থাকা সেই জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন।
বিওএটি পুরস্কারের ভোট গ্রহণ শুরু হয় ১ অক্টোবর এবং শেষ হয় ২৭ অক্টোবর। ভোটের মাধ্যমে ব্যালন ডি’অরজয়ী বিভিন্ন মৌসুমের মধ্যে সেরাটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পান ফুটবলপ্রেমীরা।
এই ভোটিং প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অংশগ্রহণের জন্য অর্থ প্রদান। প্রতিটি ভোটের জন্য একজন অংশগ্রহণকারীকে এক ইউরো দিতে হয়েছে। একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগও পেয়েছেন। ফলে এটি ছিল সাধারণ বিনা মূল্যের জনমত জরিপের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে অংশগ্রহণের একটি ব্যবস্থা।
ভোটে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে অংশগ্রহণকারীরা ব্যালন ডি’অরের প্রথম ট্রফির একটি ছবি পেয়েছেন। পাশাপাশি ২০২৭ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানের দুটি টিকিট জেতার লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগও ছিল তাঁদের জন্য।
তবে অর্থের বিনিময়ে একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকায় এই ফলাফলকে সরাসরি বিশ্বের সব ফুটবলপ্রেমীর সামগ্রিক মতামতের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ভোটের ফলাফল মূলত এই নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পছন্দ তুলে ধরে।
বিওএটি ভোটের ফলাফলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম ১২টি স্থানই দখল করেছে রোনালদো ও মেসির বিভিন্ন ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম। অর্থাৎ, অন্য কোনো ফুটবলারের ব্যালন ডি’অরজয়ী বছর এই তালিকার প্রথম ১২ স্থানে জায়গা পায়নি।
এতে বোঝা যায়, দুই মহাতারকার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাঁদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলো নিয়েও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে তালিকার শীর্ষে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম এবং তার পরেই মেসির ২০১২ সালের বছর থাকায় এই ভোটে পর্তুগিজ তারকাই এগিয়ে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ব্যালন ডি’অর বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত ফুটবল পুরস্কার। ফ্রান্সের ফুটবল সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল ১৯৫৬ সালে পুরস্কারটি চালু করে। সময়ের সঙ্গে এর পরিধি ও নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, বিওএটি আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল অতীতের ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুমগুলোর মধ্যে ভক্তদের পছন্দের সেরা বছরটি নির্ধারণ করা।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন—বিওএটি ভোটে জয়ী হওয়া এবং ব্যালন ডি’অরের মূল পুরস্কার জেতা এক বিষয় নয়। এটি অতীতের সেরা মৌসুম নিয়ে ভক্তদের ভোটে নির্ধারিত একটি স্বতন্ত্র স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতিতে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম মেসির ২০১২ সালের মৌসুমকে পেছনে ফেলেছে।