মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এ কারণে অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেন, ঋণপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশের পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল থাকছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে জ্বালানির নিয়ন্ত্রিত মূল্যের সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আশঙ্কা, এই অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবার বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে স্বস্তির পুরো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে। আগস্টে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে পরিবহন, ভাড়া, বিভিন্ন সেবা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যচাপ এখনো রয়ে গেছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন হলে বাজারে চাহিদাজনিত চাপও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
এই সময়ে শিল্প উৎপাদনও শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ—এসব সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতার ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য পুনরর্থায়ন প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য, শুধু মুদ্রানীতি ব্যবহার করে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সব বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। এর পর আন্তঃব্যাংক সুদহার এবং সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ডে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
তবে এর প্রভাব এখনো বেসরকারি ঋণবাজারে শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগে ধীরগতি, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় উদ্বেগ খেলাপি ঋণ। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা জো