মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এই নির্দেশনা সামনে এলো।
এর আগে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশে অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছিল মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ৪০টির বেশি মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। তালিকা প্রকাশের পরই দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর একটি অংশ অভিযোগ তোলে, সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার ফলে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও প্রতিক্রিয়া জানায় এবং সম্ভাব্য ব্যবস্থাটিকে ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করে আপত্তি তোলে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, তালিকায় থাকা এজেন্সিগুলোর মধ্যে দুই-তিনটি ছাড়া অধিকাংশই মূলত ডামি এজেন্সি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সক্রিয়তা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের তালিকা ও প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাখ্যা জানতে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের সরকার কাজ করছে এবং এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, শ্রমবাজার পরিচালনায় কোনো গোপনীয়তা বা সিন্ডিকেট থাকবে না। নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা জানান তিনি।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট নিয়ম এবং নিয়োগকর্তার চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকা যেমন রয়েছে, তেমনি কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা অনিয়ম ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিও প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার নতুন নির্দেশনার মূল বিষয় হলো বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশটির নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও এজেন্সিগুলোকেও মালয়েশিয়ার বিধিবিধান মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশের বিষয়টিও কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত কেন্দ্র ও নিয়ম অনুসরণ করা হলে ভুয়া স্বাস্থ্যসনদ বা অনিয়মের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে।
তবে শুধু অনুমোদিত এজেন্সি বা মেডিক্যাল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ করলেই শ্রমবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নির্বাচনের পদ্ধতি, নিয়োগকর্তার চাহিদা, ভিসা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া, অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ—সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি।
বর্তমানে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়ার আশা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপন সমঝোতা বা সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ যেন তৈরি না হয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।
শ্রমবাজার খুললে নতুন করে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ এবং খরচের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সেই সুযোগ দেশের অভিবাসন খাতের জন্য আরও কার্যকর হবে।