কুড়িগ্রামে ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া প্রায় ১২ কোটি টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর চার নেতার বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে ‘ভুক্তভোগী মাজলুম পরিবার’-এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়। কর্মসূচিতে বিনিয়োগকারী পরিবারের সদস্য ও তাদের স্বজনেরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ২০২০ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি শাহজালাল সবুজ, কর্মপরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম (রাজারহাট), জামায়াতের রোকন আব্দুস সালাম সুজা (ফুলবাড়ী) এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের বায়তুল মাল সদস্য রফিকুল ইসলাম (ভোগডাঙ্গা) ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কুড়িগ্রামের প্রায় ১৫০ জন জামায়াত সদস্যের কাছ থেকে মোট ১২ কোটি টাকা নেওয়া হয়। ওই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ তো দেওয়া হয়নি, এমনকি মূল টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বরের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কোনো কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় থাকায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। কারও সঞ্চয়, কারও ব্যবসার মূলধন কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য রাখা অর্থ এই বিনিয়োগে যুক্ত ছিল বলে তারা দাবি করেন। টাকা ফেরত না পাওয়ায় এসব পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বিষয়টি জামায়াতে ইসলামীর কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আমির আজিজুর রহমান স্বপনকে জানালে দলীয়ভাবে বিষয়টি দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগের পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জেলা জামায়াতের আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের পর রফিকুল ইসলাম (রাজারহাট)-এর রোকনিয়াত স্থায়ীভাবে মুলতবি করে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শাহজালাল সবুজের রোকনিয়াত দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
তবে অপর দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবসাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তেমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা জামায়াতের আমির। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পাওনা অর্থ ফেরতের বিষয়ে ন্যায়সংগত ও আইনসংগত যেকোনো পদক্ষেপে পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথম দিকে তারা দলীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। তাদের অভিযোগ, জেলা জামায়াতের আমিরের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হলে অভিযুক্তদের সঙ্গে বসে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সরাসরি আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে অর্থ ফেরতের চেষ্টা করতে বলা হয়।
কিন্তু সেই উদ্যোগে প্রত্যাশিত সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। মামলায় ওয়ারেন্ট জারি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলে মানববন্ধনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা।
তাদের দাবি, দ্রুত অভিযুক্তদের আইনের আওতায় এনে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাওনা ১২ কোটি টাকা উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
অভিযোগের বিষয়ে শাহজালাল সবুজের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, ‘ভিশন এন্টারপ্রাইজ’ ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা মূলত রফিকুল ইসলাম (রাজারহাট)-এর ব্যক্তিগত। ২০২০ সালে ভবিষ্যতে ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশ্যে তিনি, রফিকুল ইসলাম (ভোগডাঙ্গা) ও আব্দুস সালাম সুজাসহ রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একটি যৌথ চুক্তি করেছিলেন।
তবে ওই চুক্তির ভিত্তিতে কোনো ব্যবসা শুরু হয়নি বলে দাবি শাহজালাল সবুজের। তার ভাষ্য, চুক্তির কাগজ ব্যবহার করে তাকে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম (রাজারহাট) ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তার দাবি, শাহজালাল সবুজ, আব্দুস সালাম সুজা, রফিকুল ইসলাম (ভোগডাঙ্গা) এবং তিনি—এই চারজন পরিচালক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির বাইরে রুহুল আমীন (যাত্রাপুর) ও মাওলানা জাহিদুল ইসলাম (বুড়াবুড়ি) ব্যবসাটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ছয় পরিচালকই ব্যবসা থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ফলে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির দায়ও ছয় পরিচালকের ওপর বর্তায়। ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরতের বিষয়ে তিনি একাধিকবার অন্য পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করলেও সফল হননি বলে দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, চুক্তির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে একক ক্ষমতা দেওয়ায় ব্যাংকের বিভিন্ন চেকে তার স্বাক্ষর রয়েছে। এ কারণে তার একক নামেই ৪০টির বেশি মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর মধ্যে একটি মামলায় পরিচালকদের নামেও ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে বলে জানান তিনি।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা বলেন, তাদের মূল দাবি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো বিষয় নয়; তারা নিজেদের বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত চান। একই সঙ্গে অর্থ নেওয়া, ব্যবসা পরিচালনা এবং পরবর্তী সময়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বক্তারা বলেন, ১২ কোটি টাকা ১৫০ জনের বিনিয়োগ হলে গড়ে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। ফলে এই অর্থ আটকে যাওয়ার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বহু পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা জড়িত।
তারা দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পাওনা অর্থ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা, অর্থের প্রকৃত লেনদেন, ব্যবসার কাঠামো এবং কারা কত অর্থ গ্রহণ বা ব্যবহার করেছেন—এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও অভিযোগকারীদের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। ফলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আর্থিক নথি, ব্যবসায়িক চুক্তি, ব্যাংক লেনদেন এবং মামলার নথি যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।