বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসা গবেষণার প্রসার, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীপত্নী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান। দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান চাহিদা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন আয়োজিত স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
সেমিনারে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকে নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নত করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার প্রসার, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড চালুর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করার প্রচেষ্টাও চলছে।
স্বাস্থ্যকে নিজের পেশাগত ও ব্যক্তিগত আগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বিনিময়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সুযোগ রয়েছে। জাপানের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তব চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো গেলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শিশুদের সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন ডা. জুবাইদা রহমান। তাঁর মতে, শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মানসম্মত শিক্ষা, শক্তিশালী অর্থনীতি ও টেকসই সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, সহিংসতা ও অন্যান্য ঝুঁকি থেকে শিশু ও পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য কূটনীতির গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য কূটনীতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন দেশের সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে স্বাস্থ্য খাতের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং জনকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশনগুলোর অবদানের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা এবং বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
চিকিৎসক হিসেবে বাংলাদেশে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, উপযুক্ত স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার অগ্রগতি এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সম্পদ, দক্ষ জনবল ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ফাউন্ডেশনটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি। দেশের স্বাস্থ্য খাতের উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আরও বেশি সম্পদ ও সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসার অনুরোধও জানান তিনি।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যোন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগগুলোতে বাংলাদেশ সরকার পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
সেমিনারে তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব এবং স্বাস্থ্য গবেষণা ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার বিকাশের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিসর আরও বাড়ানোর প্রত্যাশাও তুলে ধরেন তিনি।