রাজশাহীর নাদের হাজির মোড় এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে মাহবুব আলম নামে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে এক নারীসহ আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে দীর্ঘ সময় দরজা না খোলার পর ৯৯৯ নম্বরে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা খুলে ভেতর থেকে মাহবুব আলম ও ওই নারীকে বের করেন।
ঘটনার পর দুজনকেই নগরীর চন্দ্রিমা থানায় নেওয়া হয়। সেখানে তাদের পৃথক কক্ষে রাখা হয়। তবে ওই নারী ও মাহবুব আলমের সম্পর্ক এবং ফ্ল্যাটে তাদের অবস্থানের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে ওই ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দরজায় দীর্ঘ সময় কড়া নাড়েন আন্নি আক্তার নামের এক নারী। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও দরজা খোলা হয়নি। এরপর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তাদের সদস্যরা এসে দরজা খুলে দেন।
মাহবুব আলম দাবি করেছেন, ফ্ল্যাটের ভেতরে থাকা নারী তার স্ত্রী। তবে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে থাকা আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব তাকে বিয়ে করেন।
আন্নি আক্তার নওগাঁর বাসিন্দা। তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা। তার অভিযোগ, বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন মাহবুব যে জেলায় কর্মরত থাকেন, সেখানে একাধিক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে মাহবুব আলমের বক্তব্যও রয়েছে। তিনি জানান, আন্নিকে চারদিন আগে তালাক দিয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত একটি কাগজ পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে আন্নি বলেন, তিনি তালাকের কোনো কাগজ হাতে পাননি।
আন্নির দাবি, এর আগেও রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুবের নিজস্ব ফ্ল্যাটে তিনি ওই নারীকে মাহবুবের সঙ্গে দেখেছিলেন। তখন পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেননি। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জানতে পারেন, মাহবুব নাদের হাজির মোড়ের একটি ফ্ল্যাটে গেছেন এবং সেখানে ওই নারীও রয়েছেন। এরপর শুক্রবার সকালে তিনি সেখানে যান।
পুলিশ জানায়, ফ্ল্যাটটি মাহবুবের কথিত পালিত মেয়ের নামে ভাড়া নেওয়া। সেখানে ওই মেয়ে ও তার স্বামী থাকেন বলে জানা গেছে। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফ্ল্যাটটিতে মাহবুব আলম ও ওই নারী অবস্থান করছিলেন।
ঘটনার সঙ্গে মাহবুব আলমের চাকরিজীবনের আগের কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে তিনি চন্দ্রিমা থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তিনি নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়।
তবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ জানিয়েছেন, মাহবুব আলমের কোনো ছুটি ছিল না এবং কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করেই তিনি রাজশাহীতে যান। তার ভাষ্য, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা চাকরির বিধিমালার দৃষ্টিতে অপরাধ। মাহবুব ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত হওয়ায় বিষয়টি জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানান।
এদিকে ঘটনায় লিখিত অভিযোগ করার কথা জানিয়েছেন আন্নি আক্তার। শুক্রবার দুপুরে থানায় অভিযোগ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, মাহবুব আলম ও ওই নারীকে থানায় আনা হয়েছে। তাদের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে মাহবুব আলমের করা তালাকের দাবি, ওই নারীর সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্ক এবং আন্নি আক্তারের অভিযোগ—এসব বিষয়ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।