কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আবারও অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। নদীর তীর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় বাহিরচর ইউনিয়নের পশ্চিম বাহিরচর ও চররূপপুর মৌজার মুন্সিপাড়া ও টিকটিকিপাড়া ঘাটসংলগ্ন তড়িয়ামহল এলাকায় দ্বিতীয়বারের মতো লাল পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বালু পরিবহনে ব্যবহৃত পাইপলাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিরুল আরাফাত। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহার এবং ভেড়ামারা থানার পুলিশ সদস্যরা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাহিরচর ইউনিয়নের পদ্মা নদীসংলগ্ন পশ্চিম বাহিরচর ও চররূপপুর মৌজার মুন্সিপাড়া ও টিকটিকিপাড়া ঘাটের তড়িয়ামহল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকে নিয়ম না মেনে বালু তোলার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন বাড়ছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা।
স্থানীয়ভাবে গত কয়েক বছরে নদীভাঙনে শত শত একর জমি বিলীন হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও অন্যান্য সম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে। বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীরের ভারসাম্য নষ্ট হলে ভাঙনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগ রয়েছে প্রশাসনের মধ্যে।
ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
ভেড়ামারার পদ্মা নদীর এই অঞ্চল শুধু স্থানীয় জনপদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। আশপাশে রয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে হার্ডিঞ্জ সেতু, লালন শাহ সেতু, ভারত-বাংলাদেশ কম্বাইন্ড বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
এ ধরনের স্থাপনার আশপাশে নদীর গতিপথ বা তীরের স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও পড়তে পারে। ফলে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আগেও বসানো হয়েছিল লাল পতাকা
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে অস্থিরতা, গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা এবং পরিবেশগত ক্ষতি ঠেকাতে গত ৬ জুন উপজেলা প্রশাসনের একটি দল ওই এলাকায় অভিযান চালায়। তখন পুরো বালুমহাল এলাকায় লাল পতাকা স্থাপন করা হয়।
এর আগে ৪ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বাহিরচর ইউনিয়নের বালুমহালের সড়কসংলগ্ন এলাকায় লাল পতাকা টাঙিয়েছিল। এর পাশাপাশি বালু উত্তোলন বন্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা সত্ত্বেও বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীরা আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে প্রশাসন জানতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার আবারও অভিযান চালানো হয়।
এ সময় তড়িয়ামহল এলাকায় নতুন করে লাল পতাকা স্থাপন করা হয়। বালু স্থানান্তরের কাজে ব্যবহৃত পাইপলাইনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেখান থেকে বালু সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চালানো না যায়।
নিয়মিত অভিযানের কথা প্রশাসনের
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিরুল আরাফাত বলেন, তড়িয়ামহলে দ্বিতীয়বারের মতো লাল নিশান স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ডও বসানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য, একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরও একটি অসাধু চক্রকে পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে নদীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপে একদিকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে পদ্মার তীর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের এই কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।